বিশ্ববাজারে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে তেলের দাম
ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে, এমন প্রত্যাশা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের…
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে নির্বাচনে দলটির বিপর্যয় হয়েছে বলে সরাসরি মন্তব্য করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকা রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজও যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের এসব বক্তব্যে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এই পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন ভ্যান্স। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমরা যে কারণে হেরেছি, তা হলো যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজেও গত রাতে এ কথা বলেছেন।’
সম্ভাব্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা ভ্যান্স আরও প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধের জন্য রাজনৈতিকভাবে এত বড় মূল্য দেওয়া আদৌ যুক্তিযুক্ত ছিল কি না। তাঁর ভাষায়, ‘যদি কেউ মনে করেন, এর বিনিময়ে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো সার্থক ছিল, তাহলে তিনি সেই যুক্তি দিতে পারেন।’
ভ্যান্স একটি জনমত জরিপের কথা উল্লেখ করে জানান, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, এমন মার্কিন ভোটারদের কাছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর মধ্যে দুটি ছিল ইরান যুদ্ধের অবসান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন।
রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজও যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন। বুধবার নিজের পডকাস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধটি ‘স্বল্পমেয়াদি, সিদ্ধান্তমূলক এবং দ্রুত শেষ হওয়া উচিত ছিল’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া আরেক পোস্টে ক্রুজ বলেন, যুদ্ধ অনেক বেশি দীর্ঘায়িত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘কোনো পরিস্থিতিতেই ওয়াশিংটনের উচিত নয় আয়াতুল্লাহকে শত শত কোটি ডলার দেওয়া।’
ক্রুজের এই মন্তব্যে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সমঝোতায় যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাবসহ বৃহত্তর শান্তি আলোচনার কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে প্রস্তাবিত তহবিল নিয়ে রিপাবলিকান দলের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা দেখা দেয়। ক্রুজও তখন এর সমালোচনা করে বলেছিলেন, এই অর্থ ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে বিশাল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার শামিল।
যদিও জুনে যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করতে ওই সমঝোতা হয়েছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানিয়েছেন। বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি ভ্যান্সের মূল্যায়নকে ‘অনেকাংশে সঠিক’ বলে মন্তব্য করেন। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটাররা রিপাবলিকান পার্টির ওপর থেকে সমর্থন সরিয়ে নিয়েছেন বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার জন্য যুদ্ধটি প্রয়োজনীয় ছিল বলে দাবি করেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
এর আগে চলতি সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সঠিক কাজটিই করেছি। আবারও একই কাজ করতাম।’
কেন ট্রাম্পের মিত্ররা যুদ্ধ থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান নেতাদের অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সংবিধান অনুযায়ী দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকার সুযোগ না থাকায় ট্রাম্প আগামী নির্বাচনে আর প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন থেকেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে চাইছেন।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আলজাজিরাকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার সিদ্ধান্তের পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং যুদ্ধের আর্থিক বোঝা মার্কিন অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করেছে।
মাসগ্রেভের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী রিপাবলিকান নেতাদের জন্য যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখা এখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে টেড ক্রুজ এবং প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থানের সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পক্ষে ছিলেন। মাসগ্রেভের ভাষায়, তাঁরা যে যুদ্ধের পক্ষে এত দিন প্রচার চালিয়েছেন, সেটি শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই তাঁদের জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে এখন তাঁরা পুরোপুরি যুদ্ধ থেকে সরে আসতে পারছেন না। বরং যুদ্ধ কতটা দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেসব বিষয়েই সমালোচনা সীমাবদ্ধ রাখছেন।
অন্যদিকে, ভ্যান্স রিপাবলিকান পার্টির অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিদেশি সংঘাতে কম জড়ানোর পক্ষের অংশের প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করছেন বলে মনে করেন মাসগ্রেভ। তাঁর মতে, ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের সমর্থন পেতে ভ্যান্স ইরান যুদ্ধ এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থেকেও সরে আসার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন।
মাসগ্রেভ বলেন, ‘এসবকিছুই ২০২৮ সালের নির্বাচন এবং রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করার বিষয়।’
রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেসনাল কর্মকর্তা জন ফিহেরিও মনে করেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ বড় একটি কারণ ছিল। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় এবং দুর্নীতির অভিযোগও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের নাম উল্লেখ করেন।
যুদ্ধ বন্ধে ডেমোক্র্যাটদের হাতে কী সুযোগ রয়েছে?
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ইরান যুদ্ধ বন্ধে ডেমোক্র্যাটদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সীমিত করা এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হতে পারে তাদের অন্যতম কৌশল।
বুধবার ডেমোক্র্যাটদের সিনেট নেতা চাক শুমার বলেছেন, ‘এই যুদ্ধের অবসান হওয়া উচিত।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউইয়র্কে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬।ছবি: এএফপি
ওয়াশিংটন ডিসিতে এক সংবাদ সম্মেলনে শুমার বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাতারা অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতাকে এমন একটি উপায় হিসেবে রেখেছিলেন, যার মাধ্যমে মার্কিন জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শুরু করলে তাঁকে প্রতিরোধ করা যায়।’
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যেকোনো ধরনের যুদ্ধকালীন কার্যক্রমে অর্থায়ন বন্ধ করতে একটি অন্তর্বর্তী অর্থায়ন প্রস্তাব আনার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসানের মতো করেই ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব।
অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, যুদ্ধ বন্ধে অর্থ বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করা ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকা অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেটে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি এই উদ্যোগকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া প্রতিরক্ষা বাজেট এবং ঋণসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব পাস করানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন জন ফিহেরি। তাঁর মতে, এসব বিষয়ে দ্বিদলীয় সমর্থন প্রয়োজন হবে।
অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমেও ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিভিন্ন সরকারি নীতি ও সামরিক অভিযানের বিষয়ে তদন্ত পরিচালনায় তারা আগের চেয়ে বেশি ক্ষমতা পাবে।
মাসগ্রেভের মতে, কংগ্রেসের শুনানি ও তদন্ত যুদ্ধকে আরও অজনপ্রিয় করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে সামরিক অভিযান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে কিংবা তাঁদের পদত্যাগে বাধ্য করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস সিবিএস নিউজকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধে হেগসেথের ভূমিকার জন্য তাঁকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসন ক্রো প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ‘অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে মাসগ্রেভ মনে করেন, যুদ্ধ পরিচালনার চেয়েও বড় রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হতে পারে কংগ্রেসের নির্ধারিত অর্থ ব্যয়ের সীমা মানতে ট্রাম্প প্রশাসনের অনীহাকে কেন্দ্র করে। তাঁর মতে, এ বিষয়ে লড়াই ও বিরোধের মাত্রা যুদ্ধক্ষমতা আইন বা ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট নিয়ে বিতর্কের চেয়েও বেশি হতে পারে।
ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, বিদেশে সামরিক অভিযান শুরুর আগে প্রেসিডেন্টের কংগ্রেসের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে অতীতে বিভিন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই আইনের সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন।

ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বিস্ফোরণের ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ সময় ধোঁয়ার পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একঝাঁক পাখি। ২০২৬ সালের ২ মার্চ ইরানের তেহরানে তোলা ছবি। ছবি: রয়টার্স।
নির্বাচনের পরও কি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে ভোটগ্রহণ চলার সময় হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জুনের পর ওই এলাকায় এটিই ছিল প্রথম মার্কিন হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হামলাটিকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড এমন কিছু সামরিক হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যা বুধবার থেকেই শুরু হতে পারে। ওই সময় তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থান করার কথা।
গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও কাফিয়েরো বলেছেন, ট্রাম্প সব পক্ষকে, এমনকি ইরানকেও, সব সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখতে পছন্দ করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প মনে করতে পারেন, তাঁর আর হারানোর কিছু নেই। সে ক্ষেত্রে তিনি ইরান সংকট আরও বড় পরিসরে সামরিকভাবে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কাফিয়েরো আলজাজিরাকে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগে কংগ্রেসের নতুন নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে গ্রহণ করবে না। ফলে ট্রাম্প এই সময়টিকে তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
অন্যদিকে, ইরান আগেই জানিয়েছে, তাদের ওপর যেকোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে। ফলে সামরিক উত্তেজনা আবারও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনাও চলছে
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনো আলোচনার প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের দেওয়া শর্তের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াকে ‘অবিশ্বাস্য’ ও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে তেহরান।
জর্জিও কাফিয়েরোর মতে, কাতারের মধ্যস্থতা তখনই সফল হতে পারে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাবে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল সম্ভাব্য যেকোনো কূটনৈতিক সমঝোতা ব্যাহত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে পারে।
তবে নির্বাচনের রাতে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আপাতত ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা তাঁর নেই।
এদিকে নির্বাচনে পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান নেতাদের ভিন্নমুখী বক্তব্য, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নতুন নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক প্রস্তুতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রশ্ন বাড়ছে, অন্যদিকে সামরিক ও কূটনৈতিক উভয় পথই খোলা রাখছে ওয়াশিংটন। ফলে নির্বাচনের ফলাফল ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথে কতটা পরিবর্তন আনে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au