নিহত সোহেল রানা: ছবি: সরবরাহ করা হয়েছে
মেলবোর্ন ১৬ জুলাই- জীবন আর মৃত্যু যেন পৃথক দুটি ফুল হয়ে ফুটে ছিলো ছাদের বাগানে। গোপালগঞ্জের কেরামত প্লাজার মোবাইল এক্সেসরিজের দোকানদার সোহেল রানা—পিতা ঠান্ডা মোল্লা—প্রতিদিনের মতো আজও নিজের দোকানে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই দিনটিই হয়ে উঠবে তার জীবনের শেষ দিন, তা কে জানতো?
আজ গোপালগঞ্জ পৌর মাঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সারা দেশব্যাপী পদযাত্রার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল পথসভা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ‘পদযাত্রা’ বলা হলেও, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা একে “মার্চ টু গোপালগঞ্জ” হিসেবে প্রচার চালান। গত রাত থেকে নানান গুজব ছড়িয়ে পড়ে, বলা হতে থাকে এনসিপি বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ ভেঙে ফেলতে আসছে। এই খবরে স্থানীয় জনতার মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
এনসিপির নেতারা গোপালগঞ্জে পৌঁছানোর আগেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়, বিক্ষুব্ধ জনতা সমাবেশস্থলের চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রহরায় এনসিপি নেতাদের প্রবেশ করানো হয়। বক্তব্য পর্বেও উত্তেজনা থামেনি। নেতাদের উসকানিমূলক কথাবার্তার মধ্যে এক পর্যায়ে হাসনাত আবদুল্লাহ “মুজিববাদ মুর্দাবাদ” স্লোগান দিলে জনতার ক্ষোভ আগুনের শিখার মতো ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যখন এনসিপি নেতারা শরিয়তপুরের দিকে গাড়িবহর নিয়ে রওনা দেন। তখন ছাত্রলীগ-যুবলীগ এবং স্থানীয় জনতা মিলে বহরের ওপর ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। হাতে দেশীয় অস্ত্রও দেখা যায়—রাম দা, সড়কি, টেঁটা, কোচ।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সোহেল রানা নিজের মোবাইল ফোনে জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করছিলেন। তার ফেসবুক প্রোফাইলে সেই ভিডিওর অস্তিত্ব মেলে। ভিডিও ধারণের মুহূর্তেই হঠাৎ সেনাবাহিনীর গুলি এসে বিদ্ধ করে সোহেলের বুক। দ্রুত গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও, কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুর সংবাদে শোকের ছায়া নেমে আসে সোহেলের পরিবারে। স্ত্রী জানান, এখনো লাশ হাসপাতালেই আছে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।
সবচেয়ে করুণ যে সত্য, এই মৃত্যুর কোনো বিচার হবে না—এ কথা সবাই জানে। রাষ্ট্রের কাছে এই মৃত্যু একজন ‘দুষ্কৃতিকারীর’—যে নাকি সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করতে এসেছিলো। আর পরিবারের জন্য থেকে যাবে নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো শূন্যতা আর দীর্ঘশ্বাস।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: নামা: সোহেল রানা বয়স: ৩৭ পিতা: ঠান্ডা মোল্লা গ্রাম: টুংগীপাড়া ( পূর্বপাড়া) থানা: টুংগীপাড়া, জেলা: গোপালগঞ্জ।