এখন বহু সাধারণ কাজের দায়িত্ব নিয়েছে এআই। ছবি: টমেটো ডট এআই
মেলবোর্ন, ১০ সেপ্টেম্বর – একসময় কল সেন্টারের চাকরিকে বলা হতো সবচেয়ে একঘেয়ে কাজগুলোর একটি। গ্রাহকের অভিযোগ শুনে মেনুতে ক্লিকের পর ক্লিক করা, হাতে হাতে নোট নেওয়া, আর গ্রাহকের বিরক্তি সামলানো—সব মিলিয়ে কর্মীদের জন্য ছিল মানসিক চাপে ভরা এক পৃথিবী। এমন অভিজ্ঞতার কথা বলছেন গ্রিসের নাগরিক আর্মেন কিরাকোসিয়ান, যিনি ১০ বছর আগে কল সেন্টারে চাকরির হতাশাজনক দিনগুলো কাটিয়েছেন।
কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিতে আজ ছবিটা বদলে গেছে। এখন ২৯ বছর বয়সী কিরাকোসিয়ান অ্যাথেন্সে টিটিইসি (TTEC) নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গ্রাহক ফোন করার আগেই তাঁর স্ক্রিনে চলে আসে গ্রাহকের পুরো প্রোফাইল। এমনকি কখনো কখনো আগেভাগেই জানা যায়, গ্রাহকের সমস্যাটা কী হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “এআই আমাদের ভেতরের রোবটটাকে সরিয়ে দিয়েছে।”
বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষ কল সেন্টারে কাজ করছেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এ সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। তারা গ্রাহকের মোবাইল ফোন নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে অনলাইন অর্ডারের সমস্যার সমাধান দেন। কিন্তু এ কাজ ধৈর্যের পরীক্ষা—একঘেয়েমি ও মানসিক চাপের কারণে ম্যাককিনসির তথ্য বলছে, প্রায় অর্ধেক কর্মী এক বছরের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন।
অধিকাংশ সমস্যা “ত্রুটি বা মেরামত” জাতীয়—কিছু ভেঙে যাওয়া বা কাজ না করা। এখন প্রশ্ন উঠেছে, সমাধান দেবে মানুষ, কম্পিউটার, নাকি উভয়ের সমন্বয়?
এআইয়ের উত্থান : চাকরি হারানো নাকি দক্ষতার চাহিদা?
বহু সাধারণ কাজ এখন এআই সামলাচ্ছে। এর ফলে কিছু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, আগামী ১০ বছরে কল সেন্টারের অর্ধেক চাকরি হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে একই সঙ্গে জটিল সমস্যার সমাধানে দরকার হবে আরও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর।
সুইডেনের ফিনটেক প্রতিষ্ঠান কেলারনা (Klarna) ২০২৪ সালে তাদের ৩ হাজার কর্মীর মধ্যে ৭০০ জনকে বাদ দিয়ে এআই চালু করে। কিন্তু পরিচয় চুরি বা জটিল লেনদেনের মতো সমস্যায় এআই ব্যর্থ হয়। ফলে ২০২৫ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি আবার দক্ষ কর্মী নিয়োগে বাধ্য হয়।
রেপ্লিকেন্ট নামের সফটওয়্যার কোম্পানির প্রধান নির্বাহী গাডি শামিয়ার মতে, ভবিষ্যৎ হলো “এআই–ফার্স্ট কন্টাক্ট সেন্টার”—যেখানে সাধারণ কাজ করবে এআই আর জটিল বিষয় সামলাবে দক্ষ মানুষ।
দশকের পর দশক ধরে কল সেন্টারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স (আইভিআর)—যেখানে আপনাকে বলা হয়, “সেলসের জন্য এক চাপুন, সার্ভিসের জন্য দুই।” পরে এতে ভয়েস রিকগনিশন যুক্ত হলেও, অধিকাংশ গ্রাহক মানুষ অপারেটরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চান। এতে দীর্ঘ অপেক্ষা বা ভুল বিভাগে চলে যাওয়ার মতো সমস্যার সৃষ্টি হয়।
এই সমস্যার সমাধানেই সামনে আসছে আধুনিক এআই এজেন্ট। ওপেনএআই এনেছে চ্যাটজিপিটি এজেন্ট, যা আপনার অনুরোধ থেকে প্রেক্ষাপট বুঝে আগেভাগেই সমাধান সাজেস্ট করতে পারে। যেমন—আপনি বললেন, “আমি আগামী বছরের একটি বিয়ের জন্য হোটেল খুঁজছি, কাপড় ও উপহারের অপশন দিন।” এআই আপনার প্রয়োজন বুঝে সুনির্দিষ্ট
ব্যাংক অব আমেরিকা ২০১৮ সালে চালু করে ‘এরিকা’ নামের চ্যাটবট। এটি এতটাই উন্নত যে বুঝতে পারে কোনো গ্রাহক একই সাবস্ক্রিপশন বারবার নিচ্ছেন কিংবা কম খরচের প্যাকেজ বেছে নিচ্ছেন। সমস্যা সমাধান করতে না পারলে এরিকা সঠিক বিভাগের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। ব্যাংকটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত এরিকা ৩০০ কোটিবার ব্যবহার হয়েছে।
এআইয়ের এই উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলছে রাজনৈতিক আলোচনা। ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগো ও রিপাবলিকান জিম জাস্টিস প্রস্তাব করেছেন ‘কিপ কল সেন্টার ইন আমেরিকা অ্যাক্ট’, যার উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকদের সহজে মানুষের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কল সেন্টারকে প্রণোদনা দেওয়া।
টিটিইসির পণ্য ও উদ্ভাবন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেমস বেদনার মনে করেন, আইভিআর সিস্টেম একদিন পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে। তাঁর ভাষায়, “এআই আপনাকে এমনভাবে পথ দেখাবে, যাতে মেনুর জটিলতায় ঘুরপাক খেতে না হয়।”
তবে বাস্তবতা হলো—সাধারণ সমস্যার সমাধান এআই করলেও জটিল বিষয়গুলোতে মানুষের উপস্থিতি অপরিহার্যই থেকে যাচ্ছে। তাই কল সেন্টারের ভবিষ্যৎ শুধু চাকরি কমানো নয়, বরং কাজের ধরন ও দক্ষতার মান বাড়ানো।
সূত্র: এপি নিউজ