, সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ৮৩৪ জনের মধ্যে অন্তত ৫২ জন প্রকৃত অর্থে শহীদ নন। নিহতদের অনেকেই অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা পারিবারিক বিরোধে প্রাণ হারিয়েছেন।
মেলবোর্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর- রাজধানীর ওয়ারীতে গত বছরের ১৪ আগস্ট জমিজমার বিরোধের জেরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিএনপি নেতা মো. আল-আমিন ভূঁইয়া ও তাঁর ছোট ভাই নুরুল আমিনকে। ঘটনার পর মামলায় আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আল-আমিনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ হিসেবে সরকারি প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রথম আলোর দুই মাসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ৮৩৪ জনের মধ্যে অন্তত ৫২ জন প্রকৃত অর্থে শহীদ নন। নিহতদের অনেকেই অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা পারিবারিক বিরোধে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার কেউ কেউ গণ-অভ্যুত্থানের পরের সময়ে নিহত হয়েছেন। অথচ তাঁদের নামও শহীদদের তালিকায় উঠে এসেছে।
কিভাবে তালিকায় নাম উঠল
নিহতদের স্বজনদের অনেকে স্বীকার করেছেন, তাঁদের প্ররোচনা দেওয়া হয়েছিল নাম তালিকায় যুক্ত করতে। সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায়ও অনেকে নাম তুলেছেন। শহীদ পরিবারের জন্য সরকার এককালীন ৩০ লাখ টাকা, মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা এবং ঢাকায় ফ্ল্যাট দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, তালিকাটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২২ জুন জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেছেন, আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এমন নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শহীদদের তালিকায় নাম ওঠাতে ভূমিকা রেখেছেন নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা। প্রথম আলো ৪১টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। অনেকেই স্বীকার করেছেন, তাঁদের স্বজনের মৃত্যু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে হয়নি। ছবিঃ প্রথম আলো
অসুস্থতা ও দুর্ঘটনায় নিহতরাও শহীদ!
সরকারি প্রজ্ঞাপনে নাম ওঠা কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য পুলিশের নথির সঙ্গে মিলছে না। যেমন—
- জামাল উদ্দিন (৩৫): রিকশা চালক, মোহাম্মদপুরে রিকশা চালাতে চালাতে অসুস্থ হয়ে মারা যান। অথচ তিনি শহীদ তালিকায়।
- রকিবুল হাসান (২৪): খুলনার শিক্ষার্থী, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তারপরও নাম তালিকায়।
- মহিউদ্দিন মোল্লা (৪৫): সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, অথচ পরিবার দাবি করে আন্দোলনে আঘাতে মৃত্যু হয়েছে।
- সাইফুল ইসলাম (৩৫): পরিবারের দাবি, গুলিতে নিহত; পুলিশের নথিতে লেখা আছে কাটাছেঁড়ায় মৃত্যু।
এমনকি ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পরও যারা খুন হয়েছেন, তাদের মধ্যে পাঁচজনের নামও শহীদ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনাও প্রশ্নবিদ্ধ
শহীদ তালিকায় রয়েছে ৩৫ জন অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তির নাম। এর মধ্যে নাটোরের চারজন, লালমনিরহাটের ছয়জন, বরগুনার একজন, যশোরে হোটেলে নিহত ২৩ জন। এসব মৃত্যুর বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার সময় হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, সংজ্ঞা অনুযায়ী এঁদের শহীদ বলা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেছেন, আইনে শহীদের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে, তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
পুলিশ ও ছাত্রলীগ কর্মীর নামও তালিকায়
প্রজ্ঞাপনে এখনো তিন পুলিশ সদস্যের নাম আছে। অথচ তারা আন্দোলনকারীদের দমন করতে গিয়েই নিহত হন। এমনকি পুরান ঢাকার ছাত্রলীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদকের নামও শহীদ তালিকায় উঠে এসেছে।
অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনও স্বীকার করেছে, অনৈতিকভাবে কিছু নাম ঢুকে পড়েছে। আটজনের নাম ইতিমধ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার আরও কয়েকজনের নাম যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে প্রমাণ পাওয়া গেছে, শহীদ বানিয়ে সরকারি সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি অনেক ঘটনায় মামলা করে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ শহীদ পরিবারের স্বজনেরা
ত্রুটিপূর্ণ তালিকা নিয়ে হতাশ শহীদদের পরিবার। তাঁদের মতে, এক বছরের মধ্যে প্রকৃত শহীদদের তালিকা তৈরি করার কথা ছিল। শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান বলেছেন, “আমরা চাই, প্রকৃত শহীদরাই যেন শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি পান।”
অর্থাৎ, শহীদ তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। এতে প্রকৃত শহীদদের মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি সঠিক ইতিহাসও বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সুত্রঃ প্রথম আলো