লিড নিউজ

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট ষড়যন্ত্র: নেপাল ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অযৌক্তিক কল্পকাহিনী

  • 11:26 pm - September 15, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১২০ বার
বিক্ষোভকারীদের আগুনে দগ্ধ নেপাল সুপ্রিম কোর্ট ভবন, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ [সামিক খারেল/আল জাজিরা]

মেলবোর্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর- সাম্প্রতিক সময়ে নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারতের চারপাশের প্রতিবেশী দেশগুলো এমনিতেই স্থিতিশীল নয়। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট, পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক টানাপোড়েন, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ সব মিলিয়ে একটি উত্তাল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য জরুরি হচ্ছে অতিদ্রুত প্রতিক্রিয়া না দেখানো। কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করলে উল্টো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। অপেক্ষা করে পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ দেওয়াই একটি বড় আঞ্চলিক শক্তির জন্য বাস্তবসম্মত কৌশল।

ডিপ স্টেট ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অসারতা

বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে ভারতে একটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা প্রচলিত এটি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের “লিবারেল ডিপ স্টেট”-এর ষড়যন্ত্র। বাস্তবে এই ধারণাটি নিছক কল্পকাহিনী, যার কোনও যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতি লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে দেশটির মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করা, যাতে চীনের প্রভাবকে ভারসাম্য করা যায়। বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে জর্জ বুশ, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন সব প্রশাসনই ভারতের কৌশলগত গুরুত্বকে মূল্যায়ন করেছে। তারা কখনোই ভারতের ক্ষমতাকে দুর্বল করার কৌশল নেয়নি, কারণ তা হলে তাদের নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি চীন-প্রতিরোধী কৌশল ভেস্তে যেত। সুতরাং ভারতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ বাস্তবের সঙ্গে মেলে না।

দ্বিতীয়ত, তথাকথিত “ডিপ স্টেট” ধারণাটিই বাস্তবে ভ্রান্ত। সরকারি কাঠামো বা আমলাতন্ত্র এতটাই জটিল ও বহুমুখী যে কোনো একক, সমন্বিত, গোপন গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে চালিত করতে পারবে এমন ধারণা অযৌক্তিক। এ কারণে বহু দেশে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মতো সমন্বয় কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই সমন্বয় খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। প্রশাসনিক টানাপোড়েনের কারণে প্রায়শই ভিন্ন দিকের স্বার্থ মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমলাতন্ত্রের ভেতরে একটি সমন্বিত ও গোপন শক্তি কাজ করছে এমন কল্পনা আসলে জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছাড়া আর কিছু নয়।

তৃতীয়ত, ইতিহাসে কিছু বহিরাগত হস্তক্ষেপ সফল হলেও তা ব্যতিক্রমী ঘটনা। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫৩ সালে ইরানে মোসাদ্দেকের পতন বা পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ। কিন্তু একইসঙ্গে কিউবায় কয়েক দশক ধরে কাস্ত্রোকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক বা মধ্যপ্রাচ্যে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চেষ্টা প্রায় সবক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে যে বহিরাগত শক্তির ক্ষমতা সীমিত এবং তাদের কৌশল প্রায়শই উল্টো প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে।

চতুর্থত, এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকারীরা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে, আবার অন্যদিকে চীনকেও একই ঘটনার জন্য দায়ী করেন। অর্থাৎ তারা নিজেরাই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন যে আসল শত্রু কে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনকালীন রাজনৈতিক স্বৈরাচার ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং নেপালে কে.পি. শর্মা ওলির ক্ষমতার লড়াই দেশ দুটির অস্থিরতার মূল কারণ। কিন্তু ষড়যন্ত্রতত্ত্বকারীরা এগুলো পাশ কাটিয়ে বিদেশি শক্তিকে দোষারোপ করেন। কখনও যুক্তরাষ্ট্রকে, কখনও চীনকে অর্থাৎ মূলত দোষ চাপানোর প্রবণতা। অথচ অভ্যন্তরীণ ভুল নীতি, দুর্নীতি, জনঅসন্তোষ ও গণতান্ত্রিক শূন্যতাই এই অস্থিরতার উৎস। বিদেশি ষড়যন্ত্রকে দায়ী করলে বাস্তব সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হয় এবং সমাধান জটিল হয়ে ওঠে।

এ ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করা কেবল প্রতিপক্ষকে অযথা বেশি কৃতিত্ব দেওয়া নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় শত্রু তৈরি করার ঝুঁকি বাড়ায়। জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বহিরাগত পরিকল্পনার ফল হিসেবে দেখা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এবং ভুল পথে চালিত হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

পররাষ্ট্রনীতির আদর্শীকরণ

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হচ্ছে আদর্শিক পক্ষপাত। বাস্তববাদী কূটনীতি সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, কিন্তু আদর্শবাদী কূটনীতি বন্ধু-শত্রুর দ্বৈত বিভাজনে আটকে যায়। এর ফলে কৌশলগত নমনীয়তা নষ্ট হয়। বাংলাদেশের উদাহরণে দেখা যায় ভারতের সরকারি নীতি ছিল “অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ”, কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ায় নতুন শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে, যা বাইরের দৃষ্টিতে সরকারি অবস্থান হিসেবেই ধরা হয়েছে। এতে ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থান দুর্বল হয়।

সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি মনে রাখা যে, ভারতকে ঘিরে বিরোধিতা হওয়া স্বাভাবিক, কারণ ভারতই আঞ্চলিক শক্তি। এটি ভারতের দোষ নয়, যদিও নয়াদিল্লির কৌশলবিদদের জন্য এ কথা কোনো সান্ত্বনা নয়, যাদের এই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়। নয়াদিল্লি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে যদি তারা ভুল করে, যেমন প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রকাশ্যে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ দেখায়। এটি কোনোভাবেই সহায়ক নয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভারতের সরকারি নীতি ছিল “অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ”, কিন্তু আধা-সরকারি ভারতীয় গণমাধ্যম নতুন সরকারকে লক্ষ্য করে তীব্র সমালোচনা চালিয়েছে। এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের জন্য একটি ‘ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্রকে’ দায়ী করেছে এবং ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থাকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে, যা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করলেও অনেকাংশে সরকারি মতামতের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ধরা হয়।

অবশ্যই, এ অঞ্চলের অন্যরা বোকা নয়; তারা বুঝবে যে এই অবস্থান আসলে সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করছে। এর ফলে ভারতের আনুষ্ঠানিক নিরপেক্ষ অবস্থান দুর্বল হবে যেটি সঠিক এবং বাস্তবসম্মত কৌশল, কারণ কীভাবে পরিস্থিতি গড়ে উঠবে তা কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। নয়াদিল্লি বা অন্য কেউই এই ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনকে চালিত করার সামর্থ্য রাখে না। অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সব পক্ষই আসলে একটি চালকবিহীন গাড়ির যাত্রী, যারা শুধু আশা করতে পারে যে গাড়িটি তাদের কাঙ্ক্ষিত পথে যাবে।

এ ধরনের অযৌক্তিক আচরণের একটি বড় কারণ হলো পররাষ্ট্রনীতির ক্রমবর্ধমান আদর্শীকরণ। বাস্তববাদী কূটনীতি সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করে, এমনকি যাদের সঙ্গে মতভেদ থাকতে পারে তাদের সঙ্গেও। কিন্তু অতিমাত্রায় আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বকে কঠোর বন্ধু-শত্রুর বিভাজনে দেখে। সেটা হোক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বা ভারতীয় উপমহাদেশের আঞ্চলিক রাজনীতি এই আদর্শীকৃত পররাষ্ট্রনীতি বিপজ্জনক, কারণ এটি কৌশলগত দৃষ্টিকে সংকীর্ণ করে ফেলে।

আঞ্চলিক অস্থিরতার জন্য বিদেশি শক্তিকে দায়ী করা ভারতের জন্য বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর। বাস্তবে সমস্যার উৎস হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ভারত কিংবা অন্য কোনো বহিরাগত শক্তি এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং অপেক্ষা, ধৈর্য এবং বাস্তববাদী কূটনীতি ভারতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করা একদিকে শত্রুদের অযথা বেশি গুরুত্ব দেওয়া, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় শত্রু তৈরি করার ঝুঁকি বাড়ানো।

—রাজেশ রাজাগোপালন, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগ, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি
(অনুবাদ: ওটিএন বাংলা ডেস্ক)

 

(প্রকাশিত মতামত একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত)

এই শাখার আরও খবর

ইসরায়েলের নির্বাচনে কে কী বললেন, আর ফলাফলে কার অবস্থান কোথায়?

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো দল বা জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে নেই। প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন…

পাবনায় রাতের আঁধারে শ্রমিক লীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : পাবনার আতাইকুলায় পুষ্পপাড়া হাটে গুলি করে শ্রমিক লীগ নেতাসহ দুজনকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত পৌনে ৮টার দিকে হাটের…

ডিসেম্বরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ঘটতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে এবং দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোতে কার প্রভাব কতটা থাকবে, এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে একাধিক সাম্প্রতিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। তাঁর…

জাপানি ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা শেখাতে বাংলাদেশে নতুন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ

জাপানে ও বাংলাদেশে কর্মসংস্থানে আগ্রহী তরুণদের জাপানি ভাষা শেখানো ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে জাপানের প্রতিষ্ঠান ওনোদেরা ইউজার রান এবং…

মেয়াদ শেষ হচ্ছে গঙ্গার পানি চুক্তির, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী ঢাকা

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে যাওয়ায় ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তির আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। নতুন চুক্তি না হলে দেশে…

শেখ হাসিনার জাতিসংঘে চিঠি: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অর্জনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত অসাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে জাতিসংঘের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au