জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগে সন্ত্রাসী হামলায় পুলিশ সদস্য নিহত
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- জম্মু ও কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলের অনন্তনাগ জেলায় সন্ত্রাসী হামলায় এক পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) দুপুরে এই হামলার ঘটনা ঘটে।…
মেলবোর্ন, ১৬ সেপ্টেম্বর- ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে মিল থাকলেও জাতীয় স্বার্থের জায়গায় মতভেদ প্রায়ই প্রকাশ পায়। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক অস্থিরতা সেই সম্পর্ককে নতুন এক মোড়ে নিয়ে গেছে কিনা, তা নিয়ে ভারতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক ভূরাজনৈতিক কৌশল নিয়েছেন, যা ভারতের জন্য অস্বস্তিকর। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ তিনি থামিয়েছেন। তাঁর কথায়, ভারতকে বাণিজ্য সম্পর্ক বন্ধের হুমকি দিয়েই তিনি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করেছেন। ভারত এই দাবি শুনে ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাদের কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, আর ট্রাম্পের দাবি বাস্তবতার সঙ্গেও মেলে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্পষ্ট বলেছেন, সংঘাত চলাকালে ট্রাম্প কোনো ফোন করেননি, এমনকি কোনো মার্কিন কর্মকর্তাও তখন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে মন্তব্য করেননি।
ট্রাম্প হয়তো পাকিস্তানের ওপর চাপ দিয়েছিলেন সংঘাত কমানোর জন্য। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে সেটি প্রযোজ্য নয়। কারণ, ভারত এমন একটি রাষ্ট্র, যারা স্থিতিশীলতা চায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়াতে চায় না। বরং তারা অর্থনৈতিক উন্নয়নেই মনোযোগী। তাই গত এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের পেহেলগামে পাকিস্তানি জঙ্গিদের নৃশংস হামলার পর ভারত দ্রুত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া জানায়। এই প্রতিক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় “অপারেশন সিঁদুর”। এর আওতায় পাকিস্তানের ভেতরে ৯টি পরিচিত জঙ্গি ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালানো হয়। ভারত তখন থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, এটি যুদ্ধ শুরুর পদক্ষেপ নয়, বরং যারা নিরীহ ভারতীয় নাগরিকদের হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অভিযান।

পাকিস্তানও পাল্টা আক্রমণ চালায়। নির্বিচারে ভারতীয় ভূখণ্ডে হামলা করে তারা। জবাবে ভারত আবারও নির্ভুল ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পাকিস্তানের ১১টি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। ভারতের শক্ত প্রতিক্রিয়া এবং পাকিস্তানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কূটনৈতিক চাপ মিলিয়েই পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ বন্ধে আগ্রহী হয়। ফলে সংঘাত থামাতে ট্রাম্প একক কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না। অথচ তিনি সেটিই করছেন। ভারতীয় কর্মকর্তারা তাঁর বক্তব্য স্পষ্টভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। ভারত সব সময়ই নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর গর্ব করে এবং তারা কখনোই মেনে নেবে না যে, ট্রাম্পের হুমকি বা প্রলোভনে নতি স্বীকার করেছে।
ট্রাম্পের আচরণ এর আগেও ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। গত জুনে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান মধ্যাহ্নভোজে। ওই বৈঠকে পাকিস্তানের বেসামরিক নেতৃত্বকে বাদ দেওয়া হয়। অথচ আসিম মুনিরকে ভারত সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষই একজন কট্টর ইসলামপন্থী মতাদর্শী হিসেবে দেখে।
ভারতের কর্মকর্তারা ও ব্যবসায়ী মহল চীনকে এখন এক হুমকি হিসেবে দেখছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ঠিক কোথায়, তা বোঝা কঠিন। বিশেষ করে ট্রাম্প যখন পাকিস্তানকে চীনের দেওয়া সহায়তার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নিন্দা করেননি, তখন চীন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
ভারতের কর্মকর্তারা ও ব্যবসায়ী মহল বর্তমানে চীনকে বড় হুমকি মনে করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অস্পষ্ট। ট্রাম্প প্রকাশ্যে কখনোই পাকিস্তানকে দেওয়া চীনের সহায়তার সমালোচনা করেননি। ফলে চীন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভারতের কাছে রহস্যজনক হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি চীনের প্রতি কঠোর ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর অবস্থান দোদুল্যমান। কখনো চীনের ওপর শুল্ক বসাচ্ছেন, আবার কখনো চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আমন্ত্রণে বেইজিং সফরের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এতে ভারতের অবস্থান কোথায়, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ট্রাম্পের আগের নীতি ও জো বাইডেনের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখত। চীনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধশক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। ভারতও তার “কৌশলগত স্বাধীনতা” নীতি বজায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা স্বাগত জানিয়েছিল। সে বিবেচনায় ২০১৭ সালে ভারত “কোয়াড” পুনরুজ্জীবনের পক্ষে ছিল। কারণ, চীন সীমান্তে বারবার অনুপ্রবেশ করেছে এবং পাকিস্তানকে সহযোগিতা দিয়েছে।
চীন এখন ভারতের শিল্প খাতকেও প্রভাবিত করছে। প্রকৌশলীদের যাতায়াত সীমিত করছে, ভারতীয় কারখানায় উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে। ইলেকট্রনিকস ও উৎপাদন খাত ইতিমধ্যেই ক্ষতির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে চীন ভুটান, নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় প্রভাব বাড়াচ্ছে। ভারতের কাছে এটি এক বড় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক হুমকি। পাকিস্তানকেও তারা গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে, যার মধ্যে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ডেটাও ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এই তথ্য ব্যবহার করেই পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ভারতীয় সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের অবস্থান ভারতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তিনি প্রায়ই মিত্রদের ওপর শুল্ক চাপিয়েছেন। গত ৩০ জুলাই তিনি ঘোষণা দেন, ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে এবং অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্কও বসানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি, ভারত এখনো রাশিয়া থেকে জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম কিনছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাণিজ্যকে যদি ট্রাম্প অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকেও একইভাবে কাজে লাগানো হতে পারে।
ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জিপিএস ডেটা ভাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সেই ঘটনার পর ভারত নিজের স্যাটেলাইট ব্যবস্থা তৈরি করতে বাধ্য হয়। তাই এখনো ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি ভরসাযোগ্য অংশীদার মনে করে না।
ফলে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করলেও আত্মনির্ভরতার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। এ সম্পর্ক তাই হবে স্বার্থনির্ভর, আবেগ নয় বরং বাস্তবতার ওপর দাঁড়ানো কার্যকর অংশীদারি। এখন ভারতের নীতিনির্ধারকেরা দোটানায় পড়েছেন। প্রশ্ন হলো, ভারত কি চীনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র একদিন চীনের মতো ভারতকেও ছেড়ে দেবে—এই ভয় থেকে চীনের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক ধরে রাখবে?
এই দ্বিধা মৌলিক প্রশ্ন তোলে—কোনো অংশীদারির ভবিষ্যৎ যদি কারও আত্মঅহমিকার ওপর নির্ভর করে, তবে সেই অংশীদারির মূল্য কতটুকু? ভারত হঠাৎ কোনো চাপে ভুল সিদ্ধান্ত নেবে না। বরং প্রয়োজনে দিক পরিবর্তন করবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের আনুষ্ঠানিক কোনো সামরিক চুক্তি নেই। ফলে জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মার্কিন মিত্রদের তুলনায় ভারত অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এই কৌশলগত স্বাধীনতা কাজে লাগিয়েই ভারত তার পররাষ্ট্রনীতি নতুনভাবে সাজাতে পারে।
এর ইঙ্গিত মিলেছে জুলাই মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বেইজিং সফরে। তিনি চীনের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন দ্বার খোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না, তবে আত্মনির্ভরতার ওপর জোর দিচ্ছে। এই সম্পর্ক আর আদর্শ নয়, বরং স্বার্থনির্ভর ও হিসাবি অংশীদারি হবে।
প্রতিরোধক্ষমতা, দৃঢ়তা এবং সন্ত্রাসের প্রতি শূন্য সহনশীলতা—এই তিন নীতির ওপর ভিত্তি করে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ভবিষ্যতেও এগোবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষিত কৌশলগত নীতিতেই এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ভারত ইতিমধ্যেই সেই বার্তা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ভারত এখনো ভারসাম্যের নীতি মেনে চলছে। একদিকে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বাড়তি সাবধানতা। কারণ, ভারত জানে এই সম্পর্কের কিছুটা ভাঙন হয়তো শুরু হয়ে গেছে।
শশী থারুর জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বর্তমানে ভারতের কংগ্রেস পার্টির একজন সদস্য।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: ওটিএন বাংলা ডেস্ক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au