আলাস্কায় শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নতুন অবস্থান জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক দীর্ঘ পোস্ট দেন। সেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সহায়তায় ইউক্রেন রাশিয়ার দখলে চলে যাওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।
ট্রাম্প লিখেছেন, “আমার মনে হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ইউক্রেন এ লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে এবং তারা পূর্বের ভূখণ্ডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে।”
অতীতে ট্রাম্প বারবার ন্যাটোর সমালোচনা করলেও এবার তাঁর বক্তব্যে অন্য সুর শোনা গেছে। তিনি বলেছেন, “সময়, ধৈর্য ও ইউরোপের অর্থনৈতিক সহায়তা, বিশেষ করে ন্যাটোর সমর্থন থাকলে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর সীমান্তে ফিরে যেতে পারবে। এটি একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প।”
এমনকি তিনি রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতাকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন, একটি প্রকৃত সামরিক শক্তি হলে এই যুদ্ধ ‘এক সপ্তাহেরও কম সময়ে’ শেষ হতো।
ট্রাম্পের মন্তব্যে জেলেনস্কি প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃঢ় সহযোগিতার জন্য আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে বুঝেছেন এবং যুদ্ধ অবসানে অবদান রাখার যে সংকল্প দেখিয়েছেন, তা আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।”
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তর (ক্রেমলিন) জানিয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থ ও লক্ষ্যে পৌঁছাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, “এটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। বহু প্রজন্মের জন্য আমরা এটি করছি, এর কোনো বিকল্প নেই।”
ট্রাম্পের এই অবস্থান হঠাৎ আসেনি।
ফেব্রুয়ারি ২০২৫: জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেনকে শান্তি চাইলে কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হতে পারে। এমনকি তিনি জেলেনস্কিকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, “আপনার হাতে কোনো কার্ড নেই। আপনার মানুষ মরছে, সৈন্য কমে যাচ্ছে।”
আগস্ট ২০২৫: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যুদ্ধ শেষ করতে হলে ‘ভূমির বিনিময়’ অনিবার্য হতে পারে।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ (জাতিসংঘ অধিবেশন): এবার তিনি ইউক্রেনের পূর্ণ ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের পক্ষে সওয়াল করেন এবং ন্যাটোর সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
রাশিয়া এখন ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণের চারটি প্রদেশের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে—দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া। এর মধ্যে লুহানস্ক পুরোপুরি এবং দোনেৎস্ক আংশিকভাবে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়ার প্রায় ৭৫ শতাংশও রাশিয়ার দখলে। এসব অঞ্চল শিল্প, কৃষি ও জ্বালানি সম্পদের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের সরাসরি ইঙ্গিত নয়। বরং তাঁর নতুন সুর পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আনতে একটি কৌশল হতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ কিয়ার গাইলস বলেন, “ট্রাম্প সর্বশেষ যাঁর সঙ্গে কথা বলেন, তাঁর মতামত তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়। তিনি বারবার নিজের অবস্থান বদলান এবং শব্দগুলো এমনভাবে সাজান, যাতে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। তাই আসল বিষয় হলো তিনি কী বলেন তা নয়, তিনি কী করেন।”
এ ছাড়া সম্প্রতি রাশিয়ার ড্রোন ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় ট্রাম্প হয়তো দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি এমনকি বলেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধবিমান যদি ন্যাটোর আকাশসীমা লঙ্ঘন করে, তবে সেগুলো ভূপাতিত করা উচিত।
ট্রাম্পের নতুন মন্তব্য ইউক্রেন ও ন্যাটোর জন্য ইতিবাচক হলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন—এটি কেবল কূটনৈতিক কৌশল হতে পারে। বাস্তবে ওয়াশিংটনের নীতি কতটা বদলাবে, তা নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।
সুত্রঃ আল–জাজিরা