ট্রাম্পের ঘোষণায় অস্ট্রেলিয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প ও সরকারের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে; ছবিঃ সেভেন নিউজ
মেলবোর্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্র আগামী ১ অক্টোবর থেকে ব্র্যান্ডযুক্ত বা পেটেন্ট করা ওষুধ আমদানিতে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, যেসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে, তাদের ওপর এই শুল্ক প্রযোজ্য হবে না।
এর আগে, চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা ওষুধের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। এবার ট্রাম্প জানালেন, যে কোনো ব্র্যান্ডযুক্ত বা পেটেন্ট ওষুধের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে, যদি না কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা নির্মাণ শুরু করে।
জুলাই মাসে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, যদি ওষুধ কোম্পানিগুলো উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে না সরিয়ে আনে, তাহলে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।
অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানিকারক শীর্ষ দেশগুলোর একটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওষুধ রপ্তানি করেছে। এর বড় অংশই অস্ট্রেলীয় কোম্পানি CSL-এর পণ্য, যারা যুক্তরাষ্ট্রে রক্তরস ও অন্যান্য রক্তজাত পণ্য সরবরাহ করে।
এক বিবৃতিতে CSL জানিয়েছে, তারা এই ঘোষণার বিষয়ে অবগত এবং নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কোম্পানিটি বলেছে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে ব্যাপক উৎপাদন অবকাঠামো রয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে আরও বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে। তাদের মতে, এই নতুন শুল্ক থেকে কোম্পানির ওপর তেমন কোনো বড় প্রভাব পড়বে না।
CSL বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৯ হাজার মানুষকে কর্মসংস্থান দিয়েছে। তাদের রয়েছে শত শত রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্র, ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে প্লাজমা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং উত্তর ক্যারোলিনায় টিকা উৎপাদন কারখানা।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আরও কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানি করে না, তাই এই শুল্ক তাদের প্রভাবিত করবে না।
Clarity নামের এক কোম্পানি, যা ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা উন্নয়নে কাজ করে, বলেছে তাদের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কনীতির প্রভাবে পড়বে না। কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের সব ওষুধ ও আইসোটোপ যুক্তরাষ্ট্রেই উৎপাদিত হয়। তারা বলেছে, “আমরা এমন একটি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলছি, যা সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রে একীভূত এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত।”
যুক্তরাষ্ট্রের জনশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটি প্রায় ২৩৩ বিলিয়ন ডলারের ওষুধ আমদানি করেছে। শুল্ক দ্বিগুণ হলে এর প্রভাবে মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড প্রোগ্রামের খরচ বেড়ে যেতে পারে।
বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া:
অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলনেতা সুসান লে এই শুল্কনীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “অস্ট্রেলীয় ওষুধ রপ্তানিকারকদের ওপর এই ক্ষতিকর শুল্ক আরোপ গভীরভাবে উদ্বেগজনক। এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, হাজার হাজার কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”
তবে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞ ড. ফেলিসিটি ডিন বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলিয়ায় ওষুধের প্রাপ্যতায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। তার মতে, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো শুল্ক আরোপ করলেও, তা অস্ট্রেলিয়ার ওষুধ সরবরাহ বা পিবিএস (Pharmaceutical Benefits Scheme)-এর ওপর প্রভাব ফেলবে না।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্পের ট্রুথ সোশালে দেওয়া ঘোষণায় বিস্তারিত তথ্য অনুপস্থিত। ফলে এটি নিয়ে বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই।”
অন্যান্য খাতে নতুন শুল্ক:
ফার্মাসিউটিক্যালের পাশাপাশি ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারী যানবাহনের ওপর ২৫ শতাংশ এবং রান্নাঘরের ক্যাবিনেটের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। এছাড়া বাথরুম ভ্যানিটি ও আসবাবের ওপর যথাক্রমে ৫০ ও ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, এসব পণ্যের আমদানি “অন্যায্য প্রতিযোগিতা” তৈরি করছে এবং স্থানীয় উৎপাদকদের ক্ষতি করছে। তাই দেশীয় শিল্প রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেছেন, এই শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়াবে। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল সতর্ক করে বলেছেন, “পণ্যের উচ্চমূল্য ইতিমধ্যেই মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ২.৯ শতাংশ, যা এপ্রিলের ২.৩ শতাংশ থেকে বেশি। তবে ট্রাম্প এ দাবি অস্বীকার করে বলেন, “কোনো মুদ্রাস্ফীতি নেই। আমরা অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করছি।”