যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প । ছবি: বিবিসি
মেলবোর্ন, ২৭ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন কারখানা না থাকলে বিদেশি কোম্পানির ওষুধ আমদানিতে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী ওষুধশিল্পে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিদ্ধান্তটি সরাসরি বহুজাতিক ব্র্যান্ডেড ওষুধকে লক্ষ্য করলেও এর প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের জেনেরিক ওষুধ শিল্পেও পড়তে পারে।
আগামী ১ অক্টোবর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন শুল্কনীতি কার্যকর হবে। শুধু ওষুধই নয়, ভারী ট্রাকের ওপর ২৫ শতাংশ, রান্নাঘরের ক্যাবিনেট ও বাথরুম ভ্যানিটির ওপর ৫০ শতাংশ, আর কিছু আসবাবের ওপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছে। জেনেরিক বা অ-পেটেন্ট ওষুধ উৎপাদনে দক্ষতার কারণে বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থান ক্রমেই শক্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলক কম—২০২৪ সালের হিসাবে প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ ডলার।
দেশের বেশ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) থেকে অনুমোদন পেয়েছে এবং বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে।

ট্রাম্পের ঘোষণায় অস্ট্রেলিয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প ও সরকারের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে; ছবিঃ সেভেন নিউজ
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন শুল্কনীতি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে। সরবরাহব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দিলে কাঁচামালের (এপিআই) ব্যয়ও বাড়বে। ভারত ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের বড় সরবরাহকারী হওয়ায় তারা যদি সেখানে নিজস্ব কারখানা স্থাপন করে, তাহলে বাংলাদেশি কোম্পানির প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
তবে আশার দিকও আছে। বাংলাদেশের ওষুধ মূলত জেনেরিক, যার বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে। ফলে ইউরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকার মানদণ্ড পূরণকারী কারখানার সংখ্যা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার ও সিনোভিয়া ফার্মা পিএলসির সিইও বলেন, “এই শুল্ক মূলত ব্র্যান্ডেড ওষুধের জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিকারকরা জেনেরিক ওষুধ নিয়ে কাজ করেন, তাই সরাসরি প্রভাব পড়বে না।”
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানি পরিমাণ এখনো সীমিত। তবে যদি ভারতের তুলনায় বাংলাদেশি ওষুধে শুল্ক কম থাকে, তাহলে এটি আমাদের জন্য সুযোগ হয়ে আসতে পারে।”
সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন জানান, “এই শুল্কনীতি আমাদের ওপর কার্যকর হবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। আমরা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।”
দেশের আরেক শীর্ষ কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, “জেনেরিক ওষুধ আমাদের মূল শক্তি। কিন্তু সরবরাহব্যবস্থায় চাপ এলে বিকল্প বাজারের দিকে নজর দিতে হবে। মানোন্নয়ন ছাড়া এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।”
দেশে-বাইরে বিরোধিতা:
ওষুধের ওপর নতুন শুল্কের বিরোধিতা করেছে ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অব আমেরিকা (PhRMA)। সংস্থাটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত ওষুধের উপাদানের ৫৩ শতাংশ দেশেই তৈরি হয়, বাকি অংশ আসে ইউরোপ ও মিত্রদেশগুলো থেকে। মার্কিন চেম্বার অব কমার্সও বলেছে, শীর্ষ আমদানি উৎস দেশগুলো—মেক্সিকো, কানাডা, জাপান, জার্মানি ও ফিনল্যান্ড—সবই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
ট্রাম্পের শুল্ক সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা চলছে। ৯ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে আদালত ৫ নভেম্বর মৌখিক যুক্তি উপস্থাপনের তারিখ নির্ধারণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বের ওষুধশিল্প এখন ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতির প্রভাব নিয়ে অনিশ্চয়তায়। বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর সরাসরি ক্ষতি না হলেও, কাঁচামালের ব্যয় ও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। তাই বিকল্প বাজার ও মানোন্নয়নকেই এখন সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।