সোনম ওয়াংচুক লাদাখের একজন উদ্ভাবক ও শিক্ষাসংস্কারক। নানা বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও শিক্ষাসংস্কারমূলক কাজের জন্য ভারতজুড়ে তাঁর সুনাম আছে।ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন,৮ অক্টোবর- ভারতের লাদাখে বিশিষ্ট পরিবেশবাদী ও সামাজিক কর্মী সোনাম ওয়াংচুককে—যিনি জনপ্রিয়ভাবে ‘র্যাঞ্চো’ নামে পরিচিত—গ্রেপ্তার করার পর অঞ্চলটিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তাঁর গ্রেপ্তারের পর থেকেই লাদাখের লেহ ও কারগিলজুড়ে বিক্ষোভ, অবরোধ ও প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত বেড়ে চলেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে লাদাখের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিচ্ছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর লাদাখের লেহ শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভের পর পুলিশ সোনাম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করে। ওই বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হন, আহত হন অনেকে। প্রশাসনের অভিযোগ, ওয়াংচুক “উসকানিমূলক বক্তব্য” দিয়েছেন এবং বিক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
ওয়াংচুকের নেতৃত্বাধীন পরিবেশবাদী সংগঠন SECMOL (Students’ Educational and Cultural Movement of Ladakh)-এর বিদেশি তহবিল গ্রহণের লাইসেন্সও সরকার বাতিল করেছে। সরকারের দাবি, সংস্থাটি আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে।
অন্যদিকে, ওয়াংচুকের পরিবার ও সমর্থকেরা বলেছেন, তাঁকে “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা”র শিকার করা হয়েছে, কারণ তিনি লাদাখের রাজ্য মর্যাদা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় স্বশাসনের দাবি তুলেছিলেন।
ওয়াংচুকের গ্রেপ্তারের পর থেকেই লাদাখের লেহ, কারগিল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় টানা বিক্ষোভ চলছে। বিভিন্ন সংগঠন Apex Body Leh (ABL) ও Kargil Democratic Alliance (KDA) ঘোষণা দিয়েছে যে, তাঁরা সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবেন না যতক্ষণ না গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
অঞ্চলটিতে ইন্টারনেট সেবা আংশিকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, লেহ শহরে জারি আছে ১৪৪ ধারা। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি ও গ্রেপ্তারের আতঙ্কে দৈনন্দিন জীবন থমকে গেছে।
লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর (L-G) অফিস অবশ্য দাবি করেছে, পরিস্থিতি এখন “সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে” এবং শান্তি বজায় রাখতে প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
ওয়াংচুককে গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদীরা নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, একজন অহিংস আন্দোলনকারীকে এভাবে আটক করা গণতন্ত্রের জন্য অশুভ বার্তা।
ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, লাদাখ এখন এক দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতিরোধ, এবং স্বশাসনের দাবির সঙ্গে এই গ্রেপ্তারের ঘটনা মিলে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ওয়াংচুক জেলে বসেও এক চিঠিতে তাঁর অনুসারীদের প্রতি শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন,
“গান্ধীর পথে থাকো, সহিংসতা নয়—শুধু সত্য ও সংযমই লাদাখের ভবিষ্যৎ বদলাতে পারে।”
বর্তমানে লাদাখে রাজনৈতিক সংলাপ কার্যত স্থবির। কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে আস্থা ভেঙে পড়েছে। স্বশাসনের দাবিতে নতুন করে জনআন্দোলন জোরদার হওয়ার আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
সব মিলিয়ে, পর্যবেক্ষকেরা বলছেন—সোনাম ওয়াংচুকের গ্রেপ্তার কেবল একজন ব্যক্তির আটক নয়, বরং লাদাখের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার এক নতুন অধ্যায়।
এ ঘটনায় লাদাখের পরিস্থিতি আরও জটিল হ য়ে পড়ছে, যার প্রভাব ভারতের উত্তর সীমান্ত রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
সুত্রঃ আল–জাজিরা