লিড নিউজ

বিশ্লেষণ: রাশিয়া-ভারত সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ- যে বাস্তবতা উপেক্ষিত

  • 12:01 pm - October 12, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৩৯ বার
ফাইল ছবি: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মেলবোর্ন, ১২ অক্টোবর: কয়েক মাস আগেও হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উষ্ণ আলিঙ্গন ছিল দুই দেশের “বিশেষ বন্ধুত্বের” প্রতীক। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, “We missed you; we missed you a lot.”
কিন্তু মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে সেই সম্পর্ক নেমে এসেছে ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচু পর্যায়ে।

এর মূল কারণ হিসেবে প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখন রাশিয়াকে দায়ী করছে।
ওয়াশিংটন অভিযোগ তুলেছে যে, ভারত রাশিয়া থেকে স্বল্পমূল্যের অপরিশোধিত তেল কিনে মস্কোকে ইউক্রেন যুদ্ধ চালানোর অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে। যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল ২ শতাংশেরও কম; ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ শতাংশে।

এর পর যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে এবং H-1B ভিসার আবেদন ফি বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি ভারতীয় নাগরিকদের প্রভাবিত করে। মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক ভারতের উদ্দেশে বলেন,

“Either support the dollar, support the United States of America, or pay the price.”

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের পুরনো বন্ধন

ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের শিকড় সাত দশক পুরোনো। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আগেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। নবগঠিত ভারতের শিল্প, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিনিয়োগ করে এক ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করে 

  • ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর শান্তিচুক্তি করায় মধ্যস্থতা করে,
  • ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতকে কূটনৈতিক সহায়তা দেয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এখনও ভারতের রাজনৈতিক প্রজন্মের মনে গভীরভাবে প্রোথিত।

অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক

রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। ভারতের সীমান্ত বিরোধ, বিশেষত পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে, রাশিয়ার জন্য এক বিশাল প্রতিরক্ষা বাজার তৈরি করেছে। রাশিয়া শুধু অস্ত্র বিক্রি নয়, প্রযুক্তি ভাগাভাগি করতেও উদার ছিল। যৌথভাবে তৈরি হয়েছে ব্রহ্মোস সুপারসনিক মিসাইল, একেকে-২০৩ রাইফেল, এবং Su-30 ফাইটার জেট।

অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়, যা দিল্লির কাছে এক ‘অবিশ্বাসের’ প্রতীক হিসেবে রয়ে যায়।  রাশিয়া এমনকি ভারতের হাতে পারমাণবিক সাবমেরিন পর্যন্ত দিয়েছে যা অন্য কোনো দেশ করেনি।

চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তন

তবে এই সম্পর্কের মাঝেও সমস্যা আছে। অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব, গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এবং যুদ্ধকালীন বাধা ভারতের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশের আগ্রহ বাড়িয়েছে। মোদির সরকার ইউক্রেন যুদ্ধকে প্রকাশ্যে সমর্থন না করলেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি; বরং নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী ভারসাম্য রক্ষা করছে।

“কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন”  ভারতের বৈদেশিক নীতি

ভারতের বৈদেশিক নীতির মূল দর্শন হলো “Strategic Autonomy” বা কৌশলগত স্বাধীনতা। অর্থাৎ, কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা। নিউ দিল্লির কাছে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মিত্র, আবার যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগী।

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: CC

বিশ্লেষক আলেক্সেই জাখারভ বলেন,

“India’s belief in strategic autonomy and multi-alignment is sacrosanct. It never joins one camp and abandons another.”

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতকে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করার নীতি মার্কিন পররাষ্ট্র কৌশলের জন্য “বুমেরাং” হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি। ট্রাম্পের ক্ষোভ ভারতের ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাহ্য করছে। ভারত কখনও রাশিয়ার মতো পুরনো মিত্রকে এক দিনে ছেড়ে দেবে না; আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিকেও হারানোর ঝুঁকি নেবে না।

শেষ পর্যন্ত, যেমন ২০২৫ সালের সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনে দেখা গেছে মোদির ‘বিয়ার হাগ’ কূটনীতি আবারও জানিয়ে দিল, ভারত কারও পক্ষে নয়, কেবল নিজের স্বার্থের পক্ষে।

লেখক: করিশ্মা ভ্যাস (Karishma Vyas), ABC News, Foreign Affairs

এই শাখার আরও খবর

লংমার্চ থেকে সরকার পতনের হুমকি, জামায়াত-এনসিপির লক্ষ্য কি?

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : সরকার গঠনের আট মাস না পেরোতেই রাজপথে সরব হয়ে উঠেছে বিরোধী দল। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং জ্বালানি ও…

পুলিশের সামনে বাসে ওঠার সময় নারীর মোবাইল ছিনতাই, চলন্ত বাস থেকে পড়ে গেলেন স্বামী

ঢাকার কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে পুলিশের উপস্থিতিতেই বাসে ওঠার সময় এক নারীর মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ছিনতাইকারীর ধাক্কায় চলন্ত বাস থেকে…

ছুটির পর ফ্রান্সে আবারও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু

দুই সপ্তাহের ছুটি শেষে ফ্রান্সে আবারও শুরু হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। তবে আগের কয়েক সপ্তাহের তুলনায় এবার আন্দোলনের ব্যাপ্তি অনেকটাই কম। সোমবার রাজধানী প্যারিস,…

মধ্যবর্তী নির্বাচন ভোট গণনায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রচারে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট শিবিরে উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষ করে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রকাশ্য…

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ, কয়েক দশকের রীতি ভাঙল ট্রাম্পের বিচার বিভাগ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট এবং নির্বাচনের ফল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে। দেশটির বিচার…

মাদ্রাসায় চাকরির এক মাস; দুই শিশুকে ধর্ষণ মামলায় হুজুর গ্রেপ্তার

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি আবাসিক হাফেজিয়া মাদ্রাসায় যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যে ১০ ও ১১ বছর বয়সী দুই শিশুশিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au