অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়। ছবিঃ এবিসি নিউজ
মেলবোর্ন, ১৩ অক্টোবর- অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় (WSU) আর্থিক ঘাটতির কারণে প্রায় ৪০০ কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট কর্মী সংখ্যা প্রায় ৩,৫০০, যার মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তবে এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই ফাঁস হয়েছে কিছু নথি, যেখানে দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮৫০ ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিকে পরামর্শক নিয়োগ দিচ্ছে। অন্তত সাতজন সিনিয়র পরামর্শক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে এই হারে কাজ করছেন। এক পরামর্শকের সাড়ে পাঁচ সপ্তাহের কাজের বিলই দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ডলার, যেখানে টোল ও পার্কিং বাবদ অতিরিক্ত ৩৫৫ ডলার দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও কর্মীরা। ন্যাশনাল টারশিয়ারি এডুকেশন ইউনিয়ন (NTEU)-এর স্থানীয় সভাপতি ডেভিড বারচেল বলেন, “এটি সবচেয়ে বিশৃঙ্খল পরিবর্তন প্রক্রিয়া যা আমি কখনো দেখিনি। এতে মানুষ আতঙ্কিত, হতাশ ও রাগান্বিত।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়াটি তাদের নিজস্ব টিমই পরিচালনা করছে। তবে যারা এই কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তারা অতিরিক্ত চাপের কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় কিছু পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে ইউনিয়নের অভিযোগ, একজন পরামর্শককে প্রতি সপ্তাহে ১০ হাজার ডলারের বেশি পারিশ্রমিকে একটি পূর্ণকালীন নির্বাহী পদে বসানো হয়েছে। ডেভিড বারচেল বলেন, “এই ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা নন। তারা শুধুমাত্র দিনভিত্তিক বেতনে কাজ করছেন।”
প্রশাসন বলছে, স্থায়ী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ওই পরামর্শক অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পরামর্শক নিয়োগ সীমিত পরিসরে এবং কেবল প্রয়োজনীয় খাতেই করা হচ্ছে, যেমন সাইবার নিরাপত্তা, নিয়মনীতি মেনে চলা এবং বর্তমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।
কর্মীরা বলছেন, যখন শত শত মানুষ চাকরি হারানোর আশঙ্কায় আছেন, তখন বাইরের পরামর্শকদের এত উচ্চ পারিশ্রমিকে নিয়োগ দেওয়া “অমানবিক ও হতাশাজনক।”
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় খাত সামগ্রিকভাবে এখন আর্থিক চাপে রয়েছে। সম্প্রতি এক সিনেট তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর প্রায় ৭৩৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে পরামর্শক নিয়োগে। এনটিইইউ এই ব্যয়কে “অযৌক্তিক ও শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতিকর” বলে সমালোচনা করেছে।
ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক জেমস গাথরি বলেন, “পরামর্শকরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসন কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এটি এখন একধরনের ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শিক্ষা, গবেষণা ও জনকল্যাণমূলক কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব পরামর্শককে ব্যবহার করছে যেন চাকরি ও কোর্স বাতিলের প্রকৃত তথ্য গোপন রাখা যায়। “আমরা জানিই না তারা কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে— কে চাকরি হারাবে, কোন কোর্স থাকবে না, এসবের কোনো স্বচ্ছতা নেই।”
অন্যদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে লবিং করা প্রতিষ্ঠান Universities Australia-এর প্রধান নির্বাহী লুক শিহি বলেন, “বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে মাঝে বিশেষজ্ঞ পরামর্শকের সহায়তা নেয়, যাতে টেকসইভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এটি সীমিত ও উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যয়।”
তিনি স্বীকার করেন, ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের মূল কারণ অর্থনৈতিক ঘাটতি। “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন কঠিন সময় পার করছে। সরকারকে এখনই অর্থায়ন সংস্কার করতে হবে,” বলেন শিহি।
ছাত্র প্রতিনিধিরাও এই প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ছাত্র নেতা বেইলি অ্যান্ডারসন বলেন, “আমরা ঋণ নিয়ে পড়াশোনা করছি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব সিদ্ধান্ত শিক্ষার মানকেই হুমকির মুখে ফেলছে, অথচ আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি।”
ডেভিড বারচেল বলেন, “এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রই বদলে যেতে পারে। ২ হাজার ৮০০ কর্মীর মধ্যে ৭০০ জনের পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে, অথচ তাদের বিকল্প কোথায়, সেটি কেউ জানে না। এটি ভয়ংকর এক পরিস্থিতি, এমন কিছু আমি আগে কখনো দেখিনি।”
সুত্রঃ এবিসি নিউজ