লিড নিউজ

সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাত: পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে?

  • 8:21 am - October 13, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১১৭ বার
তালেবান যোদ্ধারা যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিল, তখন পাকিস্তান ছিল তাদের অন্যতম মিত্র। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৩ অক্টোবর- সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। দুই দেশের সীমান্তে একাধিক স্থানে প্রবল লড়াইয়ের ঘটনা ঘটেছে। উভয় পক্ষই একে অপরের সীমান্তচৌকি ধ্বংস ও দখলের দাবি তুলেছে।

সংঘর্ষটি শুরু হয় আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাকতিকা প্রদেশে বিস্ফোরণের দুই দিন পর। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, পাকিস্তানের ওই হামলার জবাবে আফগান বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে অন্তত ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের ২৩ জন সেনা নিহত হলেও পাল্টা অভিযানে ২০০ জন ‘সন্ত্রাসী’কে হত্যা করা হয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি আফগান বাহিনীর এই হামলাকে ‘বিনা উসকানিতে গুলিবর্ষণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে কাবুলের দাবি, পাকিস্তান প্রথমে তাদের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে। যদিও ইসলামাবাদ সরাসরি হামলার বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।

সম্পর্কের টানাপোড়েনের পটভূমি

তালেবান যোদ্ধারা যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিল, তখন পাকিস্তান ছিল তাদের অন্যতম মিত্র। এমনকি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান সরকারের বৈধতা স্বীকার করা তিন দেশের একটি ছিল পাকিস্তান।

কিন্তু ২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, তালেবান প্রশাসন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)–এর জঙ্গিদের আফগান ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। আফগান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও ইসলামাবাদের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানে জঙ্গি হামলায় অন্তত ২ হাজার ৪১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (সিআরএসএস)। তাদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সাল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর হতে পারে।

বিস্ফোরণ থেকে সংঘাত

আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাবুল ও পাকতিকায় তিন দফা বিস্ফোরণের পর পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালায়। তালেবান এটিকে তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে। পাকিস্তান অবশ্য বলছে, তাদের টার্গেট ছিল টিটিপি প্রধান নুর ওয়ালি মেহসুদ, যিনি আফগান সীমান্তে অবস্থান করছিলেন।

কাবুলভিত্তিক বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস বলেন, “ভারত সফরে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকিকে যেভাবে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে, তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্ররোচিত করেছে।”

মিত্রতা থেকে বৈরিতা

একসময় অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থে সহযোগী হলেও এখন দুই দেশের সম্পর্ক চরম বৈরিতায় পৌঁছেছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান টিটিপি-কে আশ্রয় ও সহায়তা দিচ্ছে। টিটিপি দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে আসছে, যার ফলে ইসলামাবাদ এখন আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালাতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদ জান বাবর বলেন, “টিটিপির ধারাবাহিক হামলাই পাকিস্তানকে আফগানিস্তানে পাল্টা আঘাত হানতে বাধ্য করছে। ইসলামাবাদ বোঝাতে চাইছে, আফগান তালেবান যদি টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে পাকিস্তান নিজেই ব্যবস্থা নেবে।”

তিনি আরও বলেন, “সমস্যা হলো, টিটিপি আফগান তালেবানের ভেতরেও সমর্থন পায়। ফলে তালেবান সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পায়, কারণ এতে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

এদিকে পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ আফগান শরণার্থী বিতাড়নের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপ করেছে। আফগান সরকারের দাবি, তারা টিটিপিকে আশ্রয় দেয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, “যতক্ষণ আফগান সরকার টিটিপির উপস্থিতি অস্বীকার করবে, ততক্ষণ এই উত্তেজনা চলবে।”

দুই দেশের বক্তব্য

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আফগান বাহিনীর হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমাদের সেনারা শুধু জবাবই দেয়নি, বরং তাদের বেশ কিছু চৌকি ধ্বংস করেছে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি বলেন, “বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।”

অন্যদিকে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়েতুল্লাহ খোয়ারাজমি বলেন, “আমাদের হামলা ছিল পাল্টা জবাব। যদি পাকিস্তান আবারও আমাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে আমরা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাব।”

আগামীর সম্ভাবনা

সৌদি আরব, কাতার ও ইরান দুই দেশকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। ভারত এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি, তবে ইসলামাবাদ নয়াদিল্লি–তালেবান সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

আল-জাজিরার সঙ্গে আলাপে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত আরও বড় যুদ্ধে রূপ নেবে না। পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, “আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতা পাকিস্তানের মতো নয়। উভয় পক্ষই সংঘাত বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চায় না।”

ইব্রাহিম বাহিস বলেন, “এটি মূলত প্রতীকী প্রতিক্রিয়া। আফগান তালেবান নিজেদের জনগণকে দেখাতে চেয়েছে যে তারা দুর্বল নয়, প্রতিশোধ নিতে সক্ষম।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদ জান বাবরের মতে, কূটনৈতিক আলোচনাই এই উত্তেজনা কমানোর একমাত্র পথ। তিনি বলেন, “দুই দেশেই চীন, সৌদি আরব ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী বন্ধু আছে। তারা নিশ্চয়ই চায় না সীমান্তে আর রক্ত ঝরুক।”

শেষ পর্যন্ত দুই দেশের অস্থির সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়ে গেছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান। এই জট না মিটলে সীমান্তে শান্তি ফিরবে না বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

সুত্রঃ আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

এই শাখার আরও খবর

শরীর ম্যাসাজের কথা বলে রুমে ডেকে বলাৎকার, পালিয়ে বেরাচ্ছেন মাদ্রাসা শিক্ষক

রংপুরের কাউনিয়ায় একটি মাদ্রাসার এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের আবাসিক এক শিক্ষার্থীকে শরীর ম্যাসাজ করে দেওয়ার কথা বলে কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক…

শেষবার কি ছেলেকে দেখে যেতে পারবেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা?

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ শ্রীচিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা বর্তমানে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ছেলের কারাবন্দি জীবনের প্রায় দুই বছর পার…

বাংলাদেশে সার নিয়ে আসলে কী চলছে?

আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক। কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।…

ডেঙ্গুতে এ বছর একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৭১

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার…

গোপালগঞ্জে কনসার্টে শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আয়োজক গ্রেপ্তার

গোপালগঞ্জ পৌর পার্কে কনসার্ট আয়োজনের আগে পুলিশের অনুমতি না নেওয়া এবং অনুষ্ঠান চলাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় এফএনএফ কনভেনশন হল অ্যান্ড…

বেদখল হচ্ছে ঝিলংজা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের জায়গা, ক্ষুব্ধ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা

কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্মশানসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের কেউ কেউ নিজেদের বসতি সম্প্রসারণের জন্য শ্মশানের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au