লিড নিউজ

সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাত: পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে?

  • 8:21 am - October 13, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৪৬ বার
তালেবান যোদ্ধারা যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিল, তখন পাকিস্তান ছিল তাদের অন্যতম মিত্র। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৩ অক্টোবর- সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। দুই দেশের সীমান্তে একাধিক স্থানে প্রবল লড়াইয়ের ঘটনা ঘটেছে। উভয় পক্ষই একে অপরের সীমান্তচৌকি ধ্বংস ও দখলের দাবি তুলেছে।

সংঘর্ষটি শুরু হয় আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাকতিকা প্রদেশে বিস্ফোরণের দুই দিন পর। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, পাকিস্তানের ওই হামলার জবাবে আফগান বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে অন্তত ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের ২৩ জন সেনা নিহত হলেও পাল্টা অভিযানে ২০০ জন ‘সন্ত্রাসী’কে হত্যা করা হয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি আফগান বাহিনীর এই হামলাকে ‘বিনা উসকানিতে গুলিবর্ষণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে কাবুলের দাবি, পাকিস্তান প্রথমে তাদের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে। যদিও ইসলামাবাদ সরাসরি হামলার বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।

সম্পর্কের টানাপোড়েনের পটভূমি

তালেবান যোদ্ধারা যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিল, তখন পাকিস্তান ছিল তাদের অন্যতম মিত্র। এমনকি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান সরকারের বৈধতা স্বীকার করা তিন দেশের একটি ছিল পাকিস্তান।

কিন্তু ২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, তালেবান প্রশাসন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)–এর জঙ্গিদের আফগান ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। আফগান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও ইসলামাবাদের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানে জঙ্গি হামলায় অন্তত ২ হাজার ৪১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (সিআরএসএস)। তাদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সাল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর হতে পারে।

বিস্ফোরণ থেকে সংঘাত

আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাবুল ও পাকতিকায় তিন দফা বিস্ফোরণের পর পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালায়। তালেবান এটিকে তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে। পাকিস্তান অবশ্য বলছে, তাদের টার্গেট ছিল টিটিপি প্রধান নুর ওয়ালি মেহসুদ, যিনি আফগান সীমান্তে অবস্থান করছিলেন।

কাবুলভিত্তিক বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস বলেন, “ভারত সফরে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকিকে যেভাবে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে, তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্ররোচিত করেছে।”

মিত্রতা থেকে বৈরিতা

একসময় অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থে সহযোগী হলেও এখন দুই দেশের সম্পর্ক চরম বৈরিতায় পৌঁছেছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান টিটিপি-কে আশ্রয় ও সহায়তা দিচ্ছে। টিটিপি দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে আসছে, যার ফলে ইসলামাবাদ এখন আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালাতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদ জান বাবর বলেন, “টিটিপির ধারাবাহিক হামলাই পাকিস্তানকে আফগানিস্তানে পাল্টা আঘাত হানতে বাধ্য করছে। ইসলামাবাদ বোঝাতে চাইছে, আফগান তালেবান যদি টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে পাকিস্তান নিজেই ব্যবস্থা নেবে।”

তিনি আরও বলেন, “সমস্যা হলো, টিটিপি আফগান তালেবানের ভেতরেও সমর্থন পায়। ফলে তালেবান সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পায়, কারণ এতে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

এদিকে পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ আফগান শরণার্থী বিতাড়নের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপ করেছে। আফগান সরকারের দাবি, তারা টিটিপিকে আশ্রয় দেয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, “যতক্ষণ আফগান সরকার টিটিপির উপস্থিতি অস্বীকার করবে, ততক্ষণ এই উত্তেজনা চলবে।”

দুই দেশের বক্তব্য

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আফগান বাহিনীর হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমাদের সেনারা শুধু জবাবই দেয়নি, বরং তাদের বেশ কিছু চৌকি ধ্বংস করেছে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি বলেন, “বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।”

অন্যদিকে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়েতুল্লাহ খোয়ারাজমি বলেন, “আমাদের হামলা ছিল পাল্টা জবাব। যদি পাকিস্তান আবারও আমাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে আমরা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাব।”

আগামীর সম্ভাবনা

সৌদি আরব, কাতার ও ইরান দুই দেশকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। ভারত এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি, তবে ইসলামাবাদ নয়াদিল্লি–তালেবান সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

আল-জাজিরার সঙ্গে আলাপে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত আরও বড় যুদ্ধে রূপ নেবে না। পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, “আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতা পাকিস্তানের মতো নয়। উভয় পক্ষই সংঘাত বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চায় না।”

ইব্রাহিম বাহিস বলেন, “এটি মূলত প্রতীকী প্রতিক্রিয়া। আফগান তালেবান নিজেদের জনগণকে দেখাতে চেয়েছে যে তারা দুর্বল নয়, প্রতিশোধ নিতে সক্ষম।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদ জান বাবরের মতে, কূটনৈতিক আলোচনাই এই উত্তেজনা কমানোর একমাত্র পথ। তিনি বলেন, “দুই দেশেই চীন, সৌদি আরব ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী বন্ধু আছে। তারা নিশ্চয়ই চায় না সীমান্তে আর রক্ত ঝরুক।”

শেষ পর্যন্ত দুই দেশের অস্থির সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়ে গেছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান। এই জট না মিটলে সীমান্তে শান্তি ফিরবে না বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

সুত্রঃ আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

এই শাখার আরও খবর

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রধান শিক্ষক ভবানন্দ পালকে গ্রেপ্তার, মেলেনি জামিন

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : ঠাকুরগাঁওয়ে প্রধান শিক্ষক ভবানন্দ পালকে চেকসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় জেলা শহরের মন্দিরপাড়া…

বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল জাতীয় চার নেতা: কারাগারের অন্ধকারেও যাঁরা মাথা নত করেননি

বাংলাদেশের ইতিহাসে ৩ নভেম্বর এক গভীর শোক, বেদনা ও কলঙ্কের দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে বন্দি অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা…

জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা, নির্বাচনের আগে বিকল্প পরিকল্পনায় ট্রাম্প প্রশাসন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত…

গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে তিন মামলা, আসামি প্রায় ৪ হাজার, গ্রেপ্তার ৩০

গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে তিনটি মামলা করা হয়েছে। এসব…

তারেক রহমানের জামানায় উচ্চশিক্ষায় উল্টো চিত্র, শিক্ষার্থীদের অপেক্ষায় থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

ভাস্কর দত্ত: তারেক রহমানের সরকারের সময়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির চিত্রে দেখা দিয়েছে উল্টো সমীকরণ। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও এবার ভর্তিযোগ্য আসনের…

১২০ কিমি গতিতে অন্ধ্র উপকূলে ‘মুরাসু’র আঘাত

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মধ্যরাতে রাজ্যটির প্রকাশম জেলার ওঙ্গোলের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে ঘূর্ণিঝড়টির স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া শুরু হয়।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au