দক্ষিণ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অবস্থান করছে তিন পরাশক্তির মাঝে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের। তবু আশ্চর্যের বিষয়, দেশটি বারবার সবচেয়ে দুর্বল উদাহরণটিকেই অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
(ছবি: লেখক)
মেলবোর্ন ২১ অক্টোবর: পাকিস্তান আজ গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটে নিমজ্জিত। যে দেশ একসময় মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ নিজ সীমান্তেই যুদ্ধ করছে। আফগান তালেবান দখল করেছে পাকিস্তানের একাধিক পোস্ট, আর প্রতিশোধে পাকিস্তান বোমা ফেলছে আফগান গ্রামে। একসময় যাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, আজ সেই তালেবানই পাকিস্তানের শত্রু।
এটা প্রতিরক্ষার যুদ্ধ নয় টিকে থাকার যুদ্ধ। অথচ ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকার এখনো পাকিস্তানকে বন্ধু, এমনকি অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে দেখে। কিন্তু যে রাষ্ট্র নিজ সীমান্ত রক্ষা করতে পারে না, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ, জনগণের জীবন স্থবির সে কিভাবে অন্য কারও জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে?
অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও শাসনব্যর্থতা
পাকিস্তান আজ দুর্বল ও বিভক্ত; তার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছে। দৈনন্দিন দ্রব্যমূল্য নাগালের বাইরে, মানুষ দারিদ্র্য ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছে। সেনাবাহিনী লড়ছে তিন ফ্রন্টে বিদ্রোহী, সাধারণ মানুষ, এবং নিজেদের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে।
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশ যেন সেই একই পথে হাঁটছে। সরকার ভারতের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়, বিদেশি ষড়যন্ত্রের গল্প তোলে, অথচ ঘরোয়া সমস্যাগুলো অস্বীকার করে।
এক সপ্তাহেই দেশে ঘটেছে একাধিক দুর্ঘটনা
- চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজডুবি,
- ইপিজেডে কারখানায় আগুন,
- ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের হুমকি,
- ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, যা উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
যে সরকার নিজের বিমানবন্দরের আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে কিভাবে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের স্বপ্ন দেখে?
অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও মানবিক সংকট
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীরা নিহত হচ্ছে, সমতলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রান্ত। শিক্ষকরা কালো পতাকা মিছিল করছেন, পুলিশ ছুঁড়ছে সাউন্ড গ্রেনেড, সেনাবাহিনী বিভক্ত, নির্বাচন কেবল নাটক। নির্বাচিত সরকার ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতি অসম্ভব।
চট্টগ্রাম, নির্বাচন, সংখ্যালঘু, পার্বত্য সংকট এগুলোই আজকের প্রকৃত জরুরি ইস্যু। কিন্তু এসবের পরিবর্তে সরকার ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো প্রতিনিয়ত বিদেশবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে।
প্রতি শুক্রবার একই দৃশ্য বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল বেরিয়ে আসে, ইসরায়েল, ভারত, আমেরিকার বিরুদ্ধে চিৎকার। যেন এই শব্দই দেশের সব সমস্যার সমাধান।
আত্মসমালোচনার অভাব ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা সহজ, কিন্তু চট্টগ্রামের জাহাজ কে ডুবিয়েছে? ঢাকার বিমানবন্দর কে পুড়িয়েছে? বিদেশিরা নয়, আমরা নিজেরাই।
দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অহংকার এই তিন আগুনই দেশকে ভিতর থেকে ধ্বংস করছে।
আমরা ভুলে যাই না ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে “ভারতের ষড়যন্ত্র” বলেছিল। ফলাফল তারা নিজেদের দেশ হারিয়েছিল। আজকের বাংলাদেশ সেই একই ভুল করছে, শুধু রূপ ভিন্ন।
দুঃখজনকভাবে, ইউনুস সরকারের নীতি আজ সেই পাকিস্তানি মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।
শক্তি নয়, দুর্বলতার প্রতিধ্বনি
আজ পাকিস্তানের গর্জন আর ভয়ের নয়, করুণার প্রতীক। দুর্বল রাষ্ট্রের উচ্চ স্বর। আর বাংলাদেশ যদি সেই স্বর অনুসরণ করে, তবে নিজের কণ্ঠও হারাবে।
ভারত আজ নীরব কিন্তু দৃঢ় আমরা যেখানে বিমানবন্দর জ্বালাই, তারা নতুন বিমানবন্দর তৈরি করছে; আমরা যেখানে চিৎকার করি, তারা কাজ করছে।
কেউ বাইরে থেকে আমাদের ব্যর্থতা সৃষ্টি করেনি আমরা নিজেরাই করেছি। যতবার নেতা অন্য দেশকে দোষারোপ করেন, সত্য আরও আড়ালে যায়। মিথ্যা জাতীয়তাবাদের নামে বলা প্রতিটি শব্দ আমাদের পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
বাস্তব শক্তি আসে সততা, ঐক্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ থেকে পাকিস্তান এগুলো হারিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সুযোগ রাখে।
বাংলাদেশকে এখনই থামতে হবে। এমন এক দেশকে অনুসরণ করা যাবে না, যে নিজেকে উদ্ধার করতে পারে না। যে জাতি অন্যের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়, সে টিকে থাকে; কিন্তু যে জাতি সেই ব্যর্থতাকেই অনুকরণ করে, তার পতন অনিবার্য।
যখন সেই পতন শুরু হবে কোনো স্লোগান, কোনো মিছিল, কোনো দোয়া কিছুই তাকে রক্ষা করতে পারবে না।
পূর্ণ লাল চাকমা, টোকিও, জাপান
১৯ অক্টোবর, ২০২৫