মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২১ অক্টোবর- যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সংক্রান্ত একটি কাঠামোগত চুক্তি করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো এই খাতে চীনের আধিপত্য ভাঙা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশ আগামী কয়েক মাসে প্রায় সব অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলে প্রস্তাবিত খনিজ প্রকল্পে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অ্যান্থনি আলবেনিজ এই অংশীদারিত্বের আওতায় “গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জ্বালানি আধিপত্য” শীর্ষক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির অধীনে খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণকারী কোম্পানিগুলো অস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি এবং অন্যান্য খাতে ব্যবহৃত খনিজ উৎপাদনের জন্য অর্থায়নের আবেদন করতে পারবে।
চুক্তির প্রথম প্রকল্প হিসেবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় গ্যালিয়াম শোধনাগার স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার যৌথ অর্থায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আলকোয়া-সজিত্জ-এর আওতায় নির্মিত এই শোধনাগার বছরে প্রায় ১০০ টন গ্যালিয়াম উৎপাদন করবে। কম্পিউটার চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত গ্যালিয়ামের বৈশ্বিক চাহিদা বছরে ৭০০–৭৫০ টন, যার অধিকাংশই বর্তমানে চীনের দখলে। ফলে এই প্রকল্প বৈশ্বিক সরবরাহে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। ছবিঃ রয়টার্স
মোট মিলিয়ে, আগামী ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া জরুরি ভিত্তিতে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪.৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার) বিনিয়োগ করবে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সব অঙ্গরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্পে। ট্রাম্প বলেন, “আমরা অনেক দিন ধরে এই পরিকল্পনার ওপর কাজ করছি। এক বছরের মধ্যে এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও রেয়ার আর্থ থাকবে যে, আপনারা বুঝতে পারবেন না এগুলো দিয়ে কী করবেন। ওগুলোর মূল্য তখন হবে মাত্র দুই ডলার।”
এই কাঠামোর আওতায় প্রায় ডজনখানেক প্রকল্পে বিনিয়োগ হবে, যা অস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি তৈরিতে অপরিহার্য খনিজ উৎপাদন করবে।
চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক প্রভাব
সম্প্রতি চীন বিরল খনিজ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তি রপ্তানিতে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বেইজিংয়ের অনুমতি নিতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের খনিজ শোধন প্রক্রিয়ায় চীনের বাজার নিয়ন্ত্রণের হার প্রায় ৯০ শতাংশ, যা অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশের খনি স্থাপনাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
চীন এই খাতে ভর্তুকি দিয়ে মূল্য কমিয়ে দিয়েছে, ফলে অন্যান্য দেশ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। যদিও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুদ রয়েছে, দাম অস্থিতিশীলতা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের উচ্চ খরচের কারণে বিনিয়োগ ধীর হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া একটি “কৌশলগত খনিজ সংরক্ষণাগার” গঠন করছে, যা ‘অগ্রাধিকার খনিজের’ জন্য ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করবে। এটি আগামী বছরের শেষ নাগাদ কার্যকর হবে। নতুন যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া কাঠামো এই সংরক্ষণাগারকে কাজে লাগাবে।
প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রভাব
চুক্তির আওতায় সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর মোট মূল্য প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে রয়েছে নর্দার্ন টেরিটরির নোলানস প্রকল্পে নিওডিমিয়াম উৎপাদন, ভিক্টোরিয়া, কুইন্সল্যান্ড ও নিউ সাউথ ওয়েলসে টাইটানিয়াম ও জিরকন উৎপাদন, এবং কুইন্সল্যান্ডের একটি গ্রাফাইট খনি।
এই প্রকল্পগুলোর কিছু বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে সক্ষম। যেমন কুইন্সল্যান্ডের গ্রাফাইট খনি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রাফাইট মজুদের জন্য পরিচিত।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ইলুকা কোম্পানির এনিয়াব্বা শোধনাগার, যা ইতিমধ্যে ১.৭৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পেয়েছে, একাই বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ ভারী রেয়ার আর্থ সরবরাহ করতে পারে। এগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ির চুম্বক, সামরিক উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হবে।
খনি অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানির সংগঠন এএমইসি-র প্রধান নির্বাহী ওয়ারেন পিয়ার্স বলেন, “রেয়ার আর্থ আসলে এতটা বিরল নয়। বিরল হলো সঠিক উপাদানগুলো একই জায়গায় বাণিজ্যিকভাবে লাভজনকভাবে পাওয়া। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সেই সম্ভাবনা রাখে।”
সুত্রঃ এবিসি নিউজ