ছবিটি ঘিরে বিতর্কে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। Photo: @ChiefAdviserGoB
মেলবোর্ন, ২৮ অক্টোবর: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জাকে দেওয়া একটি উপহার ঘিরে নতুন কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
উপহারটি ছিল একটি কফি টেবিল বই “Art of Triumph: Graffiti of Bangladesh’s New Dawn” যার প্রচ্ছদে থাকা একটি ছবিকে অনেকেই “বাংলাদেশের মানচিত্র” হিসেবে শনাক্ত করেছেন। বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে কারণ সেই ছবিতে ভারতের কিছু অংশ বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার কিছু অঞ্চল বাংলাদেশের মানচিত্রের অংশ হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূচনা: পাকিস্তানি জেনারেলকে উপহার
গত শনিবার ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা যমুনায় ড. ইউনুস ও জেনারেল মির্জার মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
এই বৈঠক শেষে ড. ইউনুস তাঁর পক্ষ থেকে জেনারেল মিরজাকে উক্ত বইটি উপহার দেন।
বাংলাদেশ সরকার এখনো পর্যন্ত এই বিতর্ক নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
কিছু বাংলাদেশি এক্স (Twitter) ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, বইয়ের প্রচ্ছদের ছবিটি মানচিত্র নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা থেকে অনুপ্রাণিত একটি শিল্পকর্ম। কিন্তু ছবিটি যে বাংলাদেশের ভূচিত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়, তা অনেক পর্যবেক্ষকই নজরে এনেছেন।
পূর্ববর্তী বিতর্কের ধারাবাহিকতা
এটি প্রথম নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও ভারতের কিছু ভূখণ্ডকে বাংলাদেশের অংশ দেখিয়ে একটি সামাজিক মাধ্যম পোস্ট ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগী মাহফুজ আলম তাঁর ফেসবুক পেজে একটি “মানচিত্র” প্রকাশ করেন, যেখানে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার কিছু অংশকে “ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ” বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর তিনি পোস্টটি মুছে ফেলেন।
তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “এই ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে তাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।”
নয়া দিল্লির সতর্ক প্রতিক্রিয়া
নয়া দিল্লির কূটনৈতিক মহল এই সর্বশেষ ঘটনার প্রতিও নজর রাখছে। একাধিক সূত্র জানায়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটি পর্যালোচনা করছে এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরই ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ড. ইউনুসের সঙ্গে বৈঠকে সতর্ক বার্তা দেন যে, “বাংলাদেশের উচিত এমন কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা যা পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবেশকে ক্ষুণ্ন করে।”
কৌশলগত প্রেক্ষাপট: চীন-পাকিস্তান ইস্যু
এর আগে ড. ইউনুস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে “landlocked” বলে অভিহিত করে চীনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন “Guardian of the Ocean” হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা বাড়ানোর জন্য যা ভারতের কাছে স্পষ্টতই অস্বস্তিকর বার্তা ছিল।
তাছাড়া, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা ভারত-ঢাকা সম্পর্ককে নতুন টানাপোড়েনে ফেলেছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের দেওয়া এই “কফি টেবিল বুক” হয়তো কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রতীক হতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটিই এখন পরিণত হয়েছে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রতীক হিসেবে।
প্রচ্ছদের এক টুকরো ছবিই প্রশ্ন তুলছে বাংলাদেশ আসলেই কোন দিকের দিকে এগোচ্ছে? ভারতের বন্ধুত্বের পথে, নাকি পাকিস্তানের ছায়ায় পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তির দিকে?