ঢাকা ও বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা নতুন এক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে—চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং; ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৯ অক্টোবর: মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এমন এক চীনা নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে, যা শুধু আঞ্চলিক ভারসাম্যকেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত বহুমাত্রিকতার ধারণাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমনই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিতটি পাওয়া যায় সম্প্রতি, যখন অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা চীনের কাছ থেকে ২০টি J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ২.২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি অনুমোদন দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের জয়েন্ট স্টাফ ডিরেক্টর জেনারেল তাবাসসুম হাবিবের ঢাকা সফরের কয়েকদিন পরই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়, যা দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
আমেরিকান সাময়িকী “দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট”-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি হয়। এরপর থেকেই দেখা যাচ্ছে ভারতের প্রতি ‘প্রথম অগ্রাধিকার’ নীতির পরিবর্তে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা অংশীদারত্বের দিকে দ্রুত ঝুঁকছে ঢাকা।”
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবই কেবল মুখ্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের এখনও সুযোগ আছে যদি তারা কৌশলগতভাবে সঠিক পদক্ষেপ নেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন এক ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা ফোরামে যোগ দিয়েছে এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ বিনিময়ও শুরু করেছে। একসময় ভারতের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন চীন ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গেই সমান স্বাচ্ছন্দ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
চীনের প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং প্রতীকীও। J-10 যুদ্ধবিমান বিক্রির পাশাপাশি চীন প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা, বন্দর উন্নয়ন এবং প্রতীকী কূটনৈতিক অঙ্গীকারের আশ্বাস দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মুহাম্মদ ইউনুসের বৈঠক বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। একই সময়ে পাকিস্তানও যৌথ উৎপাদন ও সামরিক প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দিয়ে এই নতুন চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বলয়কে সুসংহত করছে।
অন্যদিকে, বেইজিং ও ইসলামাবাদ দ্রুত কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক জোরদার করলেও, যুক্তরাষ্ট্র এখনও কৌশলগত দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ চুক্তিগুলো মূলত বাণিজ্যিক, সামরিক নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ২৫টি বোয়িং যাত্রীবাহী বিমান কেনে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম ও তুলা আমদানি বাড়ায় যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কৌশলের অংশ ছিল। এসব চুক্তি বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে উপকারী হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থে তেমন অগ্রগতি আনতে পারেনি।
সূত্র: IANS / অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়া নিউজ