বাংলাদেশ

“কিসের চুমু রে!”; একটি থাপ্পড়, একটি শিশুর কান্না এবং আমাদের সামাজিক বিবেকঃ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সত্য অস্বীকারের সমাজতত্ত্ব

মতামতঃ ডঃ শ্যামল দাস

  • 6:15 am - October 26, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬১ বার

“কিসের চুমু রে!”

এই কয়েকটি শব্দের পরই গাজীপুরের টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় এক শিক্ষককে থাপ্পড় মারার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছেন একজন বাবা, তাঁর সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে এবং সেই মাদ্রাসার একজন শিক্ষক, যাঁর বিরুদ্ধে শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে।

একজন বাবা কতটা অসহায়, ক্ষুব্ধ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে তাঁর সন্তানের সঙ্গে এমন আচরণের অভিযোগ শুনে এই প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থাপ্পড় নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেই সাত বছরের শিশুটি। যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবীজুড়ে থাকার কথা খেলাধুলা, বইখাতা, বন্ধু এবং মা-বাবার স্নেহ, সেই বয়সে তাকে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের কেন্দ্রে দাঁড়াতে হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানে তার নিরাপদে শিক্ষা গ্রহণের কথা, সেই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেই উঠেছে তার শরীর ও মর্যাদা লঙ্ঘনের অভিযোগ।

ঘটনার পর শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি বলেছেন, তিনি মেয়ের বিচার চাইতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন, মব সৃষ্টি করতে নয়। অথচ ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও অর্থ লুটের পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। এরই মধ্যে পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। আদালতে শিশুটির জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এখানে আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। আমরা কি একটি থাপ্পড় নিয়ে যতটা উত্তেজিত, একটি শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে ততটাই উদ্বিগ্ন? একজন শিক্ষককে থাপ্পড় মারা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু সেই বিতর্কের আড়ালে যেন শিশুটির কান্না, তার ভয়, তার নিরাপত্তাহীনতা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার হারিয়ে না যায়।  এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের বেদনার গল্প নয়। এটি আমাদের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, সামাজিক নীরবতা, কর্তৃত্বের অপব্যবহার এবং নৈতিকতার নামে সত্য অস্বীকারের সংস্কৃতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।

কারণ গাজীপুরের এই শিশুটি একা নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের একের পর এক অভিযোগ প্রকাশিত হচ্ছে। আর এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে উঠে আসছে আরও বড় একটি প্রশ্ন: যে সমাজে ধর্মীয় নৈতিকতার কথা এত উচ্চকণ্ঠে বলা হয়, সেই সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নৈতিক দায়িত্ব কতটা পালন করা হচ্ছে?

আরেকটি ঘটনা ঘটেছে সেই গাজীপুরেই। সেখানে মাত্র আট বছরের একটি শিশুকে একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় পরপর তিন রাতে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবরের এই ঘটনার বিবরণ পড়লে যেকোনো বিবেকবান মানুষ শিউরে উঠবেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গভীর রাতে ঘুমন্ত শিশুটিকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। কাউকে কিছু জানালে মারধরের হুমকিও দেওয়া হয়। ১৩ অক্টোবর শিশুটি বাড়ি ফিরলে তার মা গোসল করানোর সময় নির্যাতনের লক্ষণ দেখতে পান। মায়ের প্রশ্নের মুখে শিশুটি তার ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা জানায়। পরে মা মামলা করেন। পুলিশ মাদ্রাসার এক শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। ২৩ অক্টোবর আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠান। (সূত্র: The Daily Star, ২৩ অক্টোবর ২০২৬; The Daily Observer, ২৩ অক্টোবর ২০২৬।)

একবার ভাবুন, কতটা বিশ্বাস নিয়ে একজন মা কিংবা বাবা তাঁর আট বছরের সন্তানকে একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান। তাঁরা আশা করেন, সেখানে সন্তান ধর্মীয় শিক্ষা পাবে, নৈতিকতা শিখবে, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এবং নিরাপদে বেড়ে উঠবে। অথচ সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই যখন শিশুর ওপর এমন নিষ্ঠুর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশ্নটি শুধু একটি অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে আমাদের শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে।

এই ঘটনার আরও একটি উদ্বেগজনক দিক রয়েছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত দুজন ব্যক্তি ঘটনাটি গোপন করার চেষ্টা করেছিলেন। অর্থাৎ অভিযোগটি শুধু একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নয়; সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্রয় ও দায় এড়ানোর বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে। এখানেই আমাদের প্রশ্ন: যে প্রতিষ্ঠান শিশুকে নৈতিকতা শেখানোর দাবি করে, সেই প্রতিষ্ঠানের নিজের নৈতিক জবাবদিহি কোথায়?

বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট?

গাজীপুরের শিশুটি একা নয়। সাম্প্রতিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলোতে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নিপীড়ন এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে। সাভারে সাত বছরের এক ছেলে শিশুকে প্রায় ছয় মাস ধরে নির্যাতনের অভিযোগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ দশজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশ একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। মামলায় অভিযুক্তদের পালাতে সহায়তা এবং শিশুকে ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীর ঘটনায় শিশুটির বাবা হুমকি পাওয়ার কথাও সংবাদমাধ্যমকে জানান। অন্যদিকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অর্থ লুটের পাল্টা অভিযোগ তোলে। উভয় পক্ষের অভিযোগ তদন্তের বিষয়।

এখানে একটি গভীর সামাজিক সংকট প্রকাশিত হয়। শিশু নির্যাতনের অভিযোগের পরও যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের সুনাম, তখন শিশুটির নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেপ্টেম্বরের আরেক ঘটনায় গাজীপুরে দুই শিক্ষার্থীকে মারধর এবং উত্তপ্ত লোহা দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগে তিন মাদ্রাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার হন। যৌন নির্যাতন ও শারীরিক নির্যাতন ভিন্ন ধরনের অপরাধ হলেও উভয় ক্ষেত্রেই শিশুদের ওপর কর্তৃত্বের অপব্যবহারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

এসব অভিযোগের বিচারিক সত্য নির্ধারণ আদালতের কাজ। কিন্তু অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ দেয়।

পরিসংখ্যান: প্রতিদিন গড়ে দুইটির বেশি শিশু যৌন সহিংসতার ঘটনা; কোথায় আমাদের সামাজিক বিবেক?

বাংলাদেশে শিশু যৌন নির্যাতনের যে চিত্র সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ছেলে ও মেয়েশিশু উভয়ের ওপর যৌন সহিংসতার পরিসংখ্যান একসঙ্গে বিবেচনা করলে সংকটের ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ১১ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত Violence Against Children, January–September 2026 প্রতিবেদনে বছরের প্রথম নয় মাসে শিশু ধর্ষণের দুটি পৃথক বিভাগে যথাক্রমে ৩১৬টি এবং ছেলেশিশু ধর্ষণের ৭৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। আসক এর শ্রেণীবিভাগ থেকে ধারনা করা যায় যে, মোট ৩১৬ টি নারী শিশু ধ র্ষনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ দুই বিভাগ মিলিয়ে ৩৯৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার দুটি বিভাগে মোট ১৫৪টি এবং যৌন হয়রানির দুটি বিভাগে ৯৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এই তিন ধরনের যৌন সহিংসতার নথিভুক্ত ঘটনা একত্র করলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪৩টি। অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৭৩ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২.৩৬টি শিশু যৌন সহিংসতার ঘটনা সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় অপরাধহার নয়; বরং প্রকাশিত ও নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব।

আরও উদ্বেগজনক হলো, আসকের প্রতিবেদনে শিক্ষক কর্তৃক যৌন হয়রানির ৪৬টি এবং শিক্ষক কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের ৫৬টি ঘটনা নথিভুক্ত রয়েছে। শিক্ষক কর্তৃক যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো উপরোক্ত ৬৪৩টির হিসাবের অন্তর্ভুক্ত; সেগুলো আবার যোগ করা হয়নি। শিক্ষক কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাগুলোও যৌন সহিংসতার হিসাব থেকে আলাদা রাখা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন JusticeMakers Bangladesh in France (JMBF)-এর পর্যবেক্ষণ তুলনা করলে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক যৌন নির্যাতনের একটি বিশেষ উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে।

সংস্থাটির ১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ১৩১টি নথিভুক্ত ঘটনায় ১৭১ জন ছেলেশিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৭২টি ঘটনা মাদ্রাসায় সংঘটিত হয়েছে এবং ভুক্তভোগী ১০৯ জন ছেলেশিশু। অর্থাৎ JMBF-এর নথিভুক্ত মোট ঘটনার প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং ভুক্তভোগী ছেলেশিশুর প্রায় ৬৪ শতাংশ মাদ্রাসাকেন্দ্রিক।

এখানে মনে রাখতে হবে, আসক ও JMBF-এর পরিসংখ্যানের পরিধি ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এক নয়। একই ঘটনা উভয় সংস্থার হিসাবে থাকতে পারে। ফলে দুটি সংস্থার সংখ্যা সরাসরি যোগ করে নতুন জাতীয় মোট সংখ্যা তৈরি করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ হবে না।

কিন্তু সংকট এখানেই শেষ নয়। অক্টোবরের প্রথম ২৪ দিনে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসন্ধানে গাজীপুরের গাছা ও টঙ্গী, ঢাকার সাভার এবং পাবনায় অন্তত চারটি পৃথক মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিশু যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ শনাক্ত করা গেছে। এসব ঘটনায় একজন ছেলেশিশু ও তিনজন মেয়েশিশু ভুক্তভোগী বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিভুক্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির পরও অক্টোবর মাসে নতুন অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।

তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের সংখ্যাই প্রকৃত নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। যৌন নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক লজ্জা, ভয়ভীতি, শিশুর অসহায়ত্ব, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য চাপ এবং অভিযোগ প্রকাশের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানে, যেখানে শিশুর দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, সেখানে অভিযোগ প্রকাশের স্বাধীন ও নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকলে নির্যাতন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

JMBF-এর প্রতিবেদনে অভিযোগ গোপন করা, পরিবারকে নীরব থাকতে বলা, অনানুষ্ঠানিক সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা এবং অভিযুক্তকে পালাতে সহায়তার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য আমাদের সামনে দুটি পৃথক কিন্তু পরস্পর-সম্পর্কিত সংকট তুলে ধরে। প্রথমটি শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা। দ্বিতীয়টি, অভিযোগ প্রকাশ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রতিকার পাওয়ার পথে সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক বাধা।

দ্বিতীয় সংকটটি প্রথমটির পুনরাবৃত্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

একটি সমাজে প্রতিদিন গড়ে দুইটির বেশি শিশু যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার পরও যদি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে না ওঠে, তাহলে প্রশ্ন শুধু অপরাধীদের নৈতিকতা নিয়ে নয়। প্রশ্ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, ধর্মীয় নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং সমাজের সম্মিলিত বিবেক নিয়েও।

মাদ্রাসা ও বন্ধ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ: গফম্যানের Total Institution

সমাজবিজ্ঞানী এরভিং গফম্যান তাঁর Asylums (1961) গ্রন্থে Total Institution বা সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিষ্ঠানের ধারণা ব্যাখ্যা করেন। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, চলাফেরা, ঘুম, খাবার, শৃঙ্খলা এবং বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সব মাদ্রাসা Total Institution নয়। কিন্তু কিছু আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুর জীবনযাত্রার ওপর যে ধরনের কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ থাকে, তা গফম্যানের বিশ্লেষণের সঙ্গে তুলনীয়। যেখানে শিক্ষক একই সঙ্গে শিক্ষাদাতা, শৃঙ্খলারক্ষক ও শাস্তিদাতা, সেখানে শিশুর পক্ষে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

মিশেল ফুকোর Discipline and Punish (1975) গ্রন্থও আমাদের দেখায়, শৃঙ্খলা, নজরদারি ও আনুগত্যের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কীভাবে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই ক্ষমতা যদি কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া পরিচালিত হয়, তাহলে শিশুদের ওপর নির্যাতনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও প্রশ্নহীন আনুগত্য

ম্যাক্স ওয়েবারের Traditional Authority এবং Charismatic Authority’র ধারণা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা একটি স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যদি প্রশ্নহীন আনুগত্যে পরিণত হয়, তাহলে শিক্ষক বা ধর্মীয় নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় অনেক অভিভাবক ধর্মীয় শিক্ষকের ওপর গভীর আস্থা রাখেন। এই আস্থা অপরাধের কারণ নয়। কিন্তু আস্থার সঙ্গে স্বাধীন তদারকি না থাকলে কোনো অসৎ ব্যক্তি তার অপব্যবহার করতে পারে।

শিশুরা বিশেষভাবে অসহায়, কারণ তারা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝে না এবং অনেক সময় নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের ভাষাও খুঁজে পায় না। অতএব ধর্মীয় শিক্ষকের মর্যাদা যত বেশি, তাঁর জবাবদিহিও তত কঠোর হওয়া উচিত।

আলেম সমাজের নৈতিক দায় কোথায়?

বাংলাদেশে ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ সামাজিক নৈতিকতা, পোশাক, সংস্কৃতি, পারিবারিক আচরণ এবং ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দেন। কিন্তু মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতৃত্বের সংগঠিত প্রতিরোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ কতটা দৃশ্যমান, সেই প্রশ্ন তোলা জরুরি। আমরা কি প্রধান ধর্মীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালার দাবি শুনছি? মাদ্রাসায় স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি কতটা জোরালো? অভিযুক্ত শিক্ষককে তদন্ত থেকে রক্ষা না করার প্রকাশ্য অঙ্গীকার কতগুলো প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করেছে? মাত্র কয়েকদিন আগে একজন পিতা এমন ঘটনার বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তার বিরুদ্ধে তথাকথিত আলেম সম্প্রদায়ের অবস্থান আমাদের বিস্মিত করে; এঁরা এমনকি বলাৎকারকেও জায়েজ বলছেন অনেকে। এটি মানা যায়না।

অবশ্যই সব আলেমকে এক শ্রেণিতে ফেলা যায় না। কিছু ধর্মীয় শিক্ষক ও নেতা শিশু নির্যাতনের বিরোধিতা করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত নিন্দা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সংগঠিত, কার্যকর ও পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ। এখানে নৈতিকতার একটি মৌলিক পরীক্ষা রয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার অর্থ কি অপরাধের অভিযোগ গোপন করা, নাকি সত্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করা? একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে হলে শিশুর অধিকারকে প্রতিষ্ঠানের সুনামের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।

রাজনৈতিক ভাষায় নারীর অবমাননা, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ এবং শিশুদের নিরাপত্তা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে অপমান করা এবং আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ভাষার ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার সঙ্গে সমাজে সহিংসতার প্রতি সহনশীলতার সম্পর্ক অনুসন্ধান করা জরুরি।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক বক্তৃতায় নারীর শরীর ও যৌনাঙ্গকে অপমানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা। কোনো নারীকে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিবারের নারী সদস্যদের যৌন অবমাননাকর ভাষায় আক্রমণ করা কেবল অশালীন বক্তব্য নয়; এটি নারীকে একজন পূর্ণ মানবিক সত্তা হিসেবে দেখার পরিবর্তে অপমান ও প্রতিশোধের বস্তুতে পরিণত করার প্রবণতার প্রকাশ।

ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির রাজনৈতিক বক্তব্যে অশোভন ও অপ্রকাশযোগ্য শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ তাঁর স্পষ্টভাষী রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশংসার চোখে দেখেছে। এই দ্বৈত প্রতিক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা কি তাঁর ব্যবহৃত অবমাননাকর ভাষার সমালোচনাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে পারে?

একজন রাজনৈতিক কর্মীর সংগ্রাম, তাঁর ওপর সংঘটিত সহিংসতা কিংবা মৃত্যুর বিচার দাবি করা এবং তাঁর বক্তব্যের নারীবিদ্বেষী উপাদানের সমালোচনা করা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উভয় অবস্থানই একসঙ্গে গ্রহণ করা সম্ভব। এখানে সমাজবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার Moral Disengagement বা নৈতিক বিচ্ছিন্নতার ধারণা প্রাসঙ্গিক। কোনো গোষ্ঠী যখন নিজেদের পছন্দের ব্যক্তির অবমাননাকর আচরণকে রাজনৈতিক সাহস, বিপ্লবী ভাষা কিংবা ন্যায়সংগত ক্ষোভ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, অথচ একই আচরণ প্রতিপক্ষ করলে নিন্দা জানায়, তখন নৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরির ঝুঁকি দেখা দেয়।

একইভাবে Social Learning Theory আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শুধু সরাসরি শিক্ষা থেকে নয়, সামাজিকভাবে পুরস্কৃত ও প্রশংসিত আচরণ পর্যবেক্ষণ করেও শেখে। ফলে প্রকাশ্যে নারীকে যৌন অবমাননা করার পর কোনো ব্যক্তি সামাজিক মর্যাদা বা প্রশংসা পেলে সেই আচরণ গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তবে রাজনৈতিক বক্তৃতায় নারীবিদ্বেষী ভাষা এবং ধর্ষণ বা শিশু যৌন নির্যাতনের মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন। এখানে প্রশ্নটি সরাসরি অপরাধ সংঘটনের কারণ নির্ধারণ নয়, বরং সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক নৈতিক বাধাগুলো কতটা কার্যকর রয়েছে, তা পরীক্ষা করা।

পরিসংখ্যানও এই উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কারণ দেখায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশ্রয়বিষয়ক সংস্থা EUAA জানিয়েছে, ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ২৫০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৪৪১টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি।

শিশুদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা যায়। একই উৎস অনুযায়ী, ছয় বছরের কম বয়সী ধর্ষণের শিকার শিশুর নথিভুক্ত সংখ্যা ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ১৪ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে ৪৮-এ পৌঁছায়। সাত থেকে বারো বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে সংখ্যা ৪০ থেকে ৮৬ এবং তেরো থেকে আঠারো বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৯৪-এ বৃদ্ধি পায়।

এসব সংখ্যা ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলার যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, বিএনপিসহ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের কাছে একটি নীতিগত প্রশ্ন তোলা জরুরি: তারা কি নিজেদের সমর্থকদের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের বিরুদ্ধেও একইভাবে অবস্থান নেবে, যেভাবে প্রতিপক্ষের বক্তব্যের সমালোচনা করে? কারণ শিশুদের নিরাপত্তা শুধু অপরাধীর শাস্তির ওপর নির্ভর করে না। তা নির্ভর করে এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতির ওপরও, যেখানে নারীর মর্যাদা, শিশুর শরীরের স্বাধীনতা এবং দুর্বল মানুষের নিরাপত্তাকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পদমর্যাদা কিংবা জনপ্রিয়তার অজুহাতে খর্ব করা যায় না।

যে সমাজে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তা কাউকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তুলে দেয়, সেই সমাজে দুর্বল মানুষের অভিযোগ শোনার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুতর, কারণ তারা প্রায়ই নিজেদের পক্ষে কথা বলার ক্ষমতা ও নিরাপদ সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

রাজনৈতিক সহিংসতাকে কখনো ন্যায়সংগত প্রতিশোধ, কখনো জনরোষ, আবার কখনো বৃহত্তর স্বার্থের প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করা হলে এই প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে। সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ, ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং জবাবদিহির অভাব একই বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশে সহাবস্থান করতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের Anomie ধারণাও এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সহায়ক। যখন সামাজিক নিয়মের কার্যকারিতা দুর্বল হয় এবং নৈতিক প্রত্যাশা ও বাস্তব আচরণের মধ্যে গভীর ব্যবধান তৈরি হয়, তখন সামাজিক সংহতি ও নিয়ন্ত্রণের সংকট দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে এই তাত্ত্বিক প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: আমরা কি এমন একটি সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তির অন্যায়কে তার রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী বিচার করা হচ্ছে?

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির জবাবদিহি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির রাজনৈতিক দর্শন ও সংগঠনগত চরিত্র এক নয়। তবে সামাজিক নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জনজীবনে নৈতিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে তাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান জনসমক্ষে আলোচিত হয়। বিশেষত যেসব রাজনৈতিক শক্তি ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের কাছে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আরও সুস্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত।

ক্ষমতাসীন সরকারের দায় আরও প্রত্যক্ষ। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের তদন্ত করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর সরকার কী ধরনের স্বাধীন পরিদর্শনব্যবস্থা চালু করেছে? আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ কতটা অগ্রসর হয়েছে? অভিযুক্তকে রক্ষা করার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? একইভাবে জামায়াত, বিএনপি, এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে প্রশ্ন করা উচিত, তারা শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কী সুনির্দিষ্ট নীতিগত প্রস্তাব দিয়েছে।

অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো এবং নীতিগত জবাবদিহি চাওয়া সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত। নৈতিকতার রাজনৈতিক ভাষণ তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন তা নিজের সমর্থক, নিজের প্রতিষ্ঠান এবং নিজের রাজনৈতিক পরিসরের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়।

সত্য অস্বীকারের সামাজিক সংস্কৃতি

স্ট্যানলি কোহেন তাঁর States of Denial (2001) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ কীভাবে অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারে। কখনো ঘটনা ঘটেছে বলেই মানতে চায় না। কখনো ঘটনা স্বীকার করেও তার গুরুত্ব কমিয়ে দেখায়। আবার কখনো ঘটনার গুরুত্ব মেনে নিয়েও দায়িত্ব গ্রহণ এড়িয়ে যায়। শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে এই তিনটি প্রক্রিয়াই সম্ভাব্যভাবে কাজ করতে পারে।

টঙ্গীর সাম্প্রতিক ঘটনায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার উদ্দেশ্যে ঘটনা সাজানো হয়েছে বলে পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে শিশুর পরিবার নির্যাতন ও হুমকির অভিযোগ করেছে। এসব বিরোধপূর্ণ দাবি তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষের প্রথম দায়িত্ব কি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা, নাকি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা করা?

যদি প্রতিষ্ঠান নিজের সুনাম রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিশুর অভিযোগকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে সেটি Institutional Betrayal বা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসভঙ্গের ঝুঁকি তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানী জেনিফার ফ্রয়েড ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় এই ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষ নিরাপত্তার জন্য নির্ভর করে, সেই প্রতিষ্ঠান নির্যাতন প্রতিরোধ বা প্রতিকারে ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগীর ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে।

Closed Society: পপারের উন্মুক্ত সমাজের বিপরীত বাস্তবতা

কার্ল পপার তাঁর The Open Society and Its Enemies গ্রন্থে উন্মুক্ত সমাজের যে ধারণা দিয়েছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে সমালোচনা, যুক্তি, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সুযোগ। একটি উন্মুক্ত সমাজে কোনো প্রতিষ্ঠান সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও নয়, রাজনৈতিক দলও নয়, রাষ্ট্রও নয়।

বিপরীতে, বন্ধ সামাজিক পরিবেশে আনুগত্য, প্রথা এবং কর্তৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা গোটা সমাজকে আমি এককভাবে “বন্ধ সমাজ” মনে করি। যেসব প্রতিষ্ঠানে অভিযোগকারী শিশুর চেয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের মর্যাদা বেশি গুরুত্ব পায়, যেখানে সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে বন্ধ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির জোরালো লক্ষণ দেখা যায়। একটি সমাজের প্রকৃত নৈতিক শক্তি বোঝা যায় তখনই, যখন সে নিজের ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে প্রস্তুত থাকে।

উপসংহার: শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মর্যাদা নেই; শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়

গাজীপুরের আট বছরের শিশুটির কথা আবার মনে করা যাক। যে বয়সে একটি শিশুর নিরাপদে ঘুমানোর কথা, সেই বয়সে তাকে গভীর রাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে তার যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করতে হয়েছে। এই ঘটনা আমাদের শুধু অপরাধীর বিচার দাবি করতে শেখায় না; এটি আমাদের নিজেদের সামাজিক বিবেককেও প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।

আমরা কী এমন সমাজ গড়েছি, যেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা কঠিন, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা বিপজ্জনক এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার জন্য শিশুর অভিযোগ উপেক্ষিত হতে পারে?  নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা ধর্মীয় বক্তৃতায় নয়, ক্ষমতাহীন মানুষের প্রতি আচরণে। যে সমাজ শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজ যতই নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ কিংবা রাজনৈতিক আদর্শের কথা বলুক, তার নৈতিকতার দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য অপরাধ গোপন করার প্রয়োজন নেই। বরং অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত পরীক্ষা।

আর রাষ্ট্রের জন্য প্রশ্নটি আরও সরল: একটি আট বছরের শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন, শাসন এবং নৈতিক নেতৃত্বের দাবির অর্থ কী? যে সমাজে শিশুর কান্নার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্মান বড় হয়ে ওঠে, সেখানে সংকট শুধু অপরাধীর নয়, সংকট সমগ্র সামাজিক বিবেকের।

বাংলাদেশে মাদ্রাসাসহ সব আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা কাঠামো প্রয়োজন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, শিক্ষক ও কর্মীদের পূর্বপরিচয় যাচাই, নিয়মিত বাহ্যিক পরিদর্শন এবং শিশুদের সঙ্গে অভিভাবকদের বাধাহীন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষক বা কর্মীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে শিশুর নিরাপত্তাকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় শিশুর গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।

একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। জনতার হাতে মারধর, প্রতিশোধ বা বিচারবহির্ভূত শাস্তি কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। ধর্মীয় নেতৃত্বকে শুধু নিন্দা প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত শিশু সুরক্ষাকে দলীয় প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে রেখে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করা। এমনকি এমন চিন্তাও করা দরকার যে, আদৌ এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমান কাঠামোতে টিকিয়ে রাখার কোন আদৌ কোন প্রয়োজন আছে কি?মূলতঃ এগুলো এখনো সেই মান্ধাতা আমলের শিক্ষাসুচী অনুসরণ করে যেখানে যুক্তি ও বিজ্ঞানের কোন স্থান নেই। এই শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির জন্য চরম ক্ষতিকর। কাজেই এই শিক্ষা নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে।

তথ্যসূত্র

  1. JusticeMakers Bangladesh in France. (2026, October 1). Report on sexual violence against boy children in Bangladesh during the first nine months of 2026.
  2. The Daily Star. (2026, October 23). Gazipur madrasa teacher sent to jail over alleged rape of 8-year-old.
  3. The Daily Observer. (2026, October 23). 2 arrested over alleged sexual abuse of madrasa student.
  4. The Daily Star. (2026, September 6). Savar Madrasa: Five arrested over rape of 7-year-old.
  5. The Daily Star. (2026, October 24). Teacher sent to jail over sexual harassment of 7-year-old.
  6. The Daily Star. (2026, September 13). 3 madrasa teachers arrested over alleged torture of two students in Gazipur.
  7. Goffman, E. (1961). Asylums. Anchor Books.
  8. Foucault, M. (1977). Discipline and punish: The birth of the prison. Pantheon Books.
  9. Cohen, S. (2001). States of denial: Knowing about atrocities and suffering. Polity.
  10. Popper, K. R. (1945). The open society and its enemies. Routledge.
  11. Bandura, A. (1999). Moral disengagement in the perpetration of inhumanities. Personality and Social Psychology Review, 3(3), 193–209.
  12. Cohen, L. E., & Felson, M. (1979). Social change and crime rate trends: A routine activity approach. American Sociological Review, 44(4), 588–608.

এই শাখার আরও খবর

ট্রানজিট করিডর নিয়ে সমঝোতা, মাতারবাড়ী বন্দরে অর্থায়নের সম্ভাবনা

জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে অর্থায়ন চুক্তি সই হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ছয় লেনের…

হুথিদের হুমকির মধ্যেই রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চালু

ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলার হুমকির মধ্যেই সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোর থেকে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম…

নোয়াখালীতে ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে দুই স্থানে গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ ২

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সোনাইমুড়ী উপজেলায় ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক দুটি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে সম্ভাব্য ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।…

দিনাজপুরে হিন্দু শিক্ষককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রাস্তার বিরোধ মেটাতে গিয়ে মনোরঞ্জন রায় (৫৫) নামে এক হিন্দু স্কুলশিক্ষককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। রোববার (২৫ অক্টোবর)…

লক্ষ্মীপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার, ১৮ দিনে আটক ১৩৮ জেলে

ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে থেমে নেই মাছ শিকার। নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১৮ দিনে ইলিশ ধরার অভিযোগে ১৩৮ জেলেকে আটক…

‘মোদির বাপও যাবেন’, খাড়গের মন্তব্যে বিতর্ক, কংগ্রেসকে নিশানা শাহের

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করতে গিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। রোববার (২৫ অক্টোবর) পাটনায় এক সভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় মোদিকে নিয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au