অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ অক্টোবর- আগামী ২০২৬ সালের বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ছয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংগঠন।
এর মধ্যে রয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস, সিভিকাস, ফর্টিফাই রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।
১৯ অক্টোবর এই সংগঠনগুলো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে সংবাদমাধ্যম, মতপ্রকাশ ও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।
চিঠির মূল বক্তব্য
চিঠিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই বিপ্লবের পর থেকে বাংলাদেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। তবে জবাবদিহি ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, এসব ঘাটতি দূর না হলে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি আবারও অবনতির ঝুঁকিতে পড়বে। তাই নির্বাচনের আগে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তারা সাংবাদিকদের নির্বিচার গ্রেপ্তার, হয়রানি ও সহিংসতা বন্ধ করা, হামলার ঘটনায় দ্রুত ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের আন্তর্জাতিক মানসম্মত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়।
এছাড়া ২০২৫ সালের সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ও মানহানির আইনসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করে এমন বিধান বাতিল বা সংশোধনের দাবি জানানো হয়।
রোহিঙ্গা ও নিরাপত্তা খাত নিয়ে উদ্বেগ
চিঠিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে বলা হয়, এখনো মিয়ানমারের কোনো অঞ্চলই স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত নয়। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে নতুন করে আসা দেড় লাখসহ প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না।
সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের চলাচল, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার স্বাধীনতা বাড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।
নিরাপত্তা খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে তারা। চিঠিতে বলা হয়, র্যাব বিলুপ্ত করা এবং ডিজিএফআইয়ের ক্ষমতা সীমিত করে নিরাপত্তা খাতে সংস্কার আনতে হবে। সামরিক সদস্যদের বেসামরিক প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
সংগঠনগুলো একাধিক সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে, যার মধ্যে রয়েছে-
- জুলাই বিপ্লব ও গত ১৫ বছরের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা।
- গুম প্রতিরোধ আইন দ্রুত পাস ও কমিশনের স্বাধীন তদন্তে সহায়তা দেওয়া।
- জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) প্যারিস প্রিন্সিপলস অনুযায়ী শক্তিশালী ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।
- রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার ও নির্বিচার গ্রেপ্তার বন্ধ করা।
- আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফেরার পথ তৈরি করা।
- এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো সংস্কার ও সুশীল সমাজের তহবিল কার্যক্রমে বাধা দূর করা।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
চিঠিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে নির্বাচনের আগে মানবাধিকার সুরক্ষায় আরও দৃশ্যমান ও স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হবে।
সংগঠনগুলো আশা প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশ এমন একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করবে যেখানে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং কোনো নাগরিক ভয়ের মধ্যে বসবাস করবে না।
সুত্রঃ সিপিজে