ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩ নভেম্বর- জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে বৈষম্যমূলক ও অকার্যকর ধারা বহাল থাকায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত এই অধ্যাদেশে এমন কিছু ধারা রয়েছে, যা স্বাধীন কমিশন গঠনের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে এবং কার্যক্রম পরিচালনায় অকার্যকরতা বাড়াতে পারে।
রোববার (২ নভেম্বর) এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “মানবাধিকার কমিশনের জন্মলগ্ন থেকেই এর অকার্যকরতার অভিজ্ঞতা আমরা পেয়েছি। এবারও সেই মৌলিক দুর্বলতার বীজ কেন অব্যাহত রাখতে হবে, তা বোধগম্য নয়।”
টিআইবি জানায়, তাদের ও অন্যান্য অংশীজনের দেওয়া বেশ কিছু ইতিবাচক প্রস্তাব খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপেক্ষিত হওয়ায় কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশনের চেয়ারপারসনসহ সাত সদস্যের মধ্যে দুইজনকে খণ্ডকালীন নিয়োগের বিধান বৈষম্যমূলক এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মর্যাদা ও এখতিয়ারের ভারসাম্য নষ্ট করে। এটি অতীতে কমিশনের অকার্যকরতার একটি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে। তিনি বলেন, “সব সদস্যের পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও সুবিধা সমান হতে হবে, এবং দায়িত্ব-কর্তব্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।”
তিনি আরও জানান, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাইয়ের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত এবং রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশকৃত প্রার্থীদের তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা গৃহীত হয়নি। এতে করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
টিআইবি আরও বলেছে, আটকস্থল আইনবহির্ভূত বলে বিবেচিত হলে কমিশনের তা বন্ধ করার ক্ষমতা ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মানবাধিকার সংরক্ষণবিরোধী কোনো আইন পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুপারিশের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও উপেক্ষিত হয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অধ্যাদেশের ১৪ নম্বর ধারায় যদি উল্লেখ থাকত যে মানবাধিকারসংক্রান্ত অন্য কোনো আইন এই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে মানবাধিকার আইনটি প্রাধান্য পাবে, তাহলে ভবিষ্যতে আইনগত জটিলতা ও বাধা মোকাবিলা সহজ হতো। কিন্তু সেই অংশটি যুক্ত করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, সব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অনুসন্ধান বাধ্যতামূলক না করে সরাসরি তদন্তের সুযোগ রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তা গৃহীত না হওয়ায় অযথা দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তির ন্যায়বিচার পেতে বিলম্ব হবে।
টিআইবি দাবি করেছে, সরকারি কর্মচারীদের কমিশনে প্রেষণে নিয়োগ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে সীমিত করার প্রস্তাবও উপেক্ষা করা হয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের নিয়োগ উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
সংস্থাটি আরও বলেছে, কমিশনের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক অডিট সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি ওয়েবসাইটে প্রকাশের ধারা সংযোজন করা প্রয়োজন। তবে এই প্রস্তাবও অধ্যাদেশে প্রতিফলিত হয়নি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “মানবাধিকার কমিশনের কার্যকরতা নিশ্চিত করতে হলে বৈষম্যমূলক ধারা বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে স্বতন্ত্র, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় পুনর্গঠন করতে হবে। অন্যথায় কমিশন আবারও আগের মতো অকার্যকর হয়ে পড়বে।”