অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত অপেরা হাউস। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ নভেম্বর- জীবনযাত্রার ব্যয় ও সীমিত আয়ের কারণে দলে দলে মানুষ নিউজিল্যান্ড ছেড়ে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটির ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বেশি নাগরিক দেশত্যাগ করেছেন। তাদের বেশিরভাগই যাচ্ছেন প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ায়, যেখানে সুযোগ-সুবিধা ও বেতনের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
নিউজিল্যান্ডের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটস এনজেড জানিয়েছে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত গত এক বছরে ৭৩ হাজার ৯০০ নিউজিল্যান্ডবাসী দেশ ছেড়েছেন। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশই গেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ৩০ হাজার নিউজিল্যান্ডার অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়েছেন – যা গত দশকের সর্বোচ্চ সংখ্যা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিবাসন ঢেউয়ের মূল কারণ দুই দেশের আয়ের বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়। অস্ট্রেলিয়ায় মাথাপিছু আয় যেখানে প্রায় ৬৪ হাজার ৪০০ ডলার, নিউজিল্যান্ডে তা মাত্র ৪৮ হাজার ডলার। ফলে অনেকে ভালো সুযোগ, স্থিতিশীল জীবন ও কম খরচের আশায় সিডনি, মেলবোর্ন বা ব্রিসবেনের মতো শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন।
২২ বছর বয়সী জেনিভিভ ফালটন, ওয়েলিংটনের একজন তরুণী, জানুয়ারিতে চলে গেছেন মেলবোর্নে। আগে ঘণ্টায় আয় করতেন ২২.৭০ নিউজিল্যান্ড ডলার, এখন তার দ্বিগুণ আয় করছেন। এতে তিনি কম সময় কাজ করেও নিজের প্রিয় ইলাস্ট্রেশন পেশায় মন দিতে পারছেন।
একইভাবে, ওয়েলিংটনের তরুণ হেইডেন ফিশার জানান, নিউজিল্যান্ডে যেখানে সপ্তাহে আয়ের অর্ধেক চলে যেত বাজারে, সেখানে সিডনিতে এখন একই পণ্য কিনতে হচ্ছে এক-চতুর্থাংশ মূল্যে। তাঁর কথায়, “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছি এখন যেটা ওয়েলিংটনে অসম্ভব মনে হয়েছিল।”
অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী সামোয়ান ট্যাটুশিল্পী টাইলা ভায়াউ বলেন, “অকল্যান্ড আর আমার বেড়ে ওঠার শহরের মতো নেই। জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাড়ির দাম এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ফেরার চিন্তা করাও অসম্ভব।” তিনি এখন পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে স্থায়ী হয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো নিউজিল্যান্ডারদের প্রায় ৮০ শতাংশ বসবাস করেন বড় শহরগুলোতে। এর মধ্যে ব্রিসবেন ও গোল্ড কোস্টে এক-তৃতীয়াংশের বেশি, আর বাকিরা থাকেন মেলবোর্ন ও সিডনিতে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ অ্যালান গ্যামলেন বলেন, “১৯৭০-এর দশক থেকেই এই প্রবণতা বাড়ছে। নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতি তুলনামূলক দুর্বল, এবং বৈশ্বিক ধাক্কায় দ্রুত প্রভাবিত হয়। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া চাকরির সুযোগ, বেতন এবং জীবনমানের দিক থেকে অনেক এগিয়ে।”
নিউজিল্যান্ড সরকার এই ‘মেধা পাচার’ (Brain Drain) নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও, পরিস্থিতির পরিবর্তনে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এদিকে, অনেক তরুণ মনে করছেন সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়, বরং স্থিতিশীল জীবনই এখন বেশি প্রয়োজন।
হেইডেন ফিশারের ভাষায়,
“নিউজিল্যান্ড সুন্দর দেশ ঠিকই, কিন্তু সুন্দর পাহাড় ভাড়া আর বিল পরিশোধ করে না।”