বাংলাদেশের খাদ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দুবাই থেকে যে চাল আসছে সেটি মূলত ভারতীয় চাল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় চাল আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে, যা জনগণের অর্থের অপচয়।
মেলবোর্ন, ৫ নভেম্বর: বাংলাদেশ, যে দেশ একসময় ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন বাধ্য হচ্ছে ভারতের পণ্য দুবাই হয়ে বেশি দামে কিনতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মরুভূমির শহর দুবাই কোনোভাবেই চাল উৎপাদন করে না; বরং দেশটি ভারত থেকে চাল আমদানি করে এবং পুনরায় রপ্তানি করে থাকে। ফলে বাংলাদেশ যখন দুবাই থেকে চাল কিনছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—ভারত থেকে সরাসরি না এনে কেন একটি মধ্যবর্তী দেশ হয়ে কেনা হচ্ছে?
বাংলাদেশের খাদ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দুবাই থেকে যে চাল আসছে সেটি মূলত ভারতীয় চাল, কিন্তু সরবরাহকারীর অফিস দুবাইয়ে অবস্থিত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় চাল আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে, যা জনগণের অর্থের অপচয়।
সরকারি ব্যাখ্যা
bddigest.com-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ক্রয় বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান বলেছেন, “সরবরাহকারীর অফিস দুবাইয়ে, কিন্তু চালের উৎস ভারত।”
গত ২২ অক্টোবর সরকারি ক্রয় পরামর্শ কমিটি মিয়ানমার ও দুবাই থেকে মোট ১ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ৫০ হাজার টন আতপ চাল এবং দুবাই থেকে ৫০ হাজার টন নন-বাসমতী সিদ্ধ চাল কেনা হবে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৬.২৩ কোটি টাকা।
চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে মুনিরুজ্জামান বলেন, “আমাদের চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবুও ঝুঁকি এড়াতে কিছু চাল আমদানি করা হয়। গত বছর বন্যার পর কিছু চাল বিতরণ করতে হয়েছিল। এবার তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র এক লাখ টন আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল মজুত রয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি।”
ভারতবিমুখ নীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিতে শুরু করে।
ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উষ্ণ সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। অথচ ভারতই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সবচেয়ে বড় মিত্র।
এই কূটনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ নিজেই ক্ষতির মুখে পড়ছে এতে রপ্তানি ব্যয় বেড়েছে, বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভারতীয় বাজারে প্রবেশে বাধা তৈরি হচ্ছে, এবং স্থলবন্দর বন্ধ থাকায় এখন সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে, ফলে খরচও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ভারতের নভভারত টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (GTRI)-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন,
“বাংলাদেশ নিজেই নিজের ক্ষতি করছে, ভারতকে নয়। ভারত বাংলাদেশের পণ্যের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, শুধু স্থলপথে পরিবহন সীমিত করেছে।”
GTRI-এর হিসাব অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ প্রায় ৭৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতির মুখে পড়বে, যা দ্বিপাক্ষিক আমদানির ৪২ শতাংশ।
ভারত থেকে সরাসরি পণ্য না এনে দুবাইয়ের মতো মধ্যবর্তী দেশের মাধ্যমে চাল কেনা শুধু অদক্ষ নীতি নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকরও। অধ্যাপক ইউনুস সরকারের ভারতবিমুখ নীতির প্রভাব ইতোমধ্যেই বাণিজ্য ও কূটনীতিতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণের অর্থে চাল কেনার এই অতিরিক্ত ব্যয় এখন প্রশ্ন তুলছে- রাজনীতি কি অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে?