বাংলাদেশ

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরও বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা অধরা

  • 9:35 pm - November 06, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৬৬ বার
বাংলাদেশে দায়মুক্তি পাচ্ছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীরা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ নভেম্বর- এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক গতি ও আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে, তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মেরুকরণ ও নিরাপত্তাজনিত অস্থিরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দমননীতির অভিযোগ

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতনের পর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল সেনাবাহিনী ও ছাত্রনেতারা। তবে এক বছরের মাথায় সরকার এখন সেনাবাহিনী, বিরোধী দল ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতা এখনো নিয়মিত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দমন করছে।

সরকার “অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা” জারি করেছে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন কার্যক্রমে, এবং দলটির নিবন্ধনও বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে ইউনুস প্রশাসনের ওপর জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টিকে (এনসিপি) সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়িয়েছে।

অর্থনীতির টানাপোড়েন

অর্থনৈতিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জে আছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি করেছে। কৃষিখাত দুর্বল, আগস্ট মাসে দশ মাসের মধ্যে প্রথমবার উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। পোশাকশিল্পে ৯০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, চাকরি হারিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক। বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়ায় সামাজিক বৈষম্যও বেড়েছে। ব্যাংক খাত দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় জর্জরিত, অকার্যকর ঋণ ও নগদ সংকটও তীব্র। দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে তৈরি পোশাক খাত আরও চাপে পড়েছে।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন

চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে সরকারের ইসলামপন্থী অংশীদারদের ভারতবিরোধী বক্তব্য এবং শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় দেওয়ার ইস্যু। ঢাকা এখনো দিল্লির কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করে আসছে। ফলে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্যের বিনিময় চলছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশি অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা আবারও সামনে এসেছে। সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর উপস্থিতি দেশের ভেতরে নতুন সামাজিক চাপ তৈরি করেছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বেইজিংয়ের বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এই প্রচেষ্টায় বাধা তৈরি করছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি ফ্লাইট ও বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় শুরু হয়েছে, কিন্তু ভারত হয়ে যোগাযোগ না থাকায় বাণিজ্যের সুযোগ সীমিত।

নির্বাচনী অনিশ্চয়তা

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। শিক্ষার্থী আন্দোলনের নেতৃত্বে গঠিত এনসিপি তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। তবে গোপন সমর্থন এখনো আওয়ামী লীগের দিকেই বেশি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

সেনাবাহিনী নির্বাচনের পক্ষে, তবে ইসলামপন্থী জোট জিতলে তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। বিএনপি “জাতীয় ঐক্য সরকার” গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে জামায়াত ও এনসিপি অংশ নিতে পারে।

সম্ভাব্য চিত্র

সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো: সহিংসতা ও বিক্ষোভের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, বিএনপি জয়ী হলেও কম ভোটে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। অন্য সম্ভাবনা হলো, সেনাবাহিনীর সহায়তায় আওয়ামী লীগ বাদে একটি ঐক্য সরকার গঠিত হবে, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনও আসবে না।

বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে। রাজনৈতিক পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক চাপে নতি স্বীকার এবং আঞ্চলিক কূটনীতির অস্থিরতার মধ্যে দোদুল্যমান।


লেখক- হুসেইন হাক্কানি হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে জটিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক পরিচালনার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। তিনি বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ছিলেন এবং কূটনীতি, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইসলামি রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।

মূল প্রতিবেদনঃ  Geopolitical Intelligence Services ; অনুবাদ ও সম্পাদনা: ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

‘নো গ্যাস নো বিল, নো সার্ভিস নো ট্যাক্স’

গ্যাস সংকট ও নাগরিক সেবার ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি গ্যাস…

দীর্ঘ সময় ইতালির ক্ষমতায় থাকা মেলোনিকে মোদির শুভেচ্ছা, কী ছিল বার্তায়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছেন জর্জিয়া মেলোনি। এই সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র…

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ: জাতিসংঘ

জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত আগস্টে আন্তর্জাতিক খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক বেড়ে ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে…

অটো পাইলট মোডে মহাসড়কের মাঝখানে থেমে যায় টেসলা, পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় চালক নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় গভীর রাতে ব্যস্ত মহাসড়কের মাঝখানে একটি টেসলা গাড়ি হঠাৎ সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার পর পেছন থেকে আসা বিশালাকৃতির ফোর্ড এফ-৩৫০ পিকআপ ট্রাকের ধাক্কায় গাড়িটির…

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au