মেলবোর্ন, ১২ নভেম্বর- ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার এক বছর পূর্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র যেন রীতিমতো এক প্রতিরোধের দেশ। প্রশাসনের নীতি ও আচরণের বিরুদ্ধে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, সংগঠন, এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন। রাস্তায়, আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদমাধ্যমে সবখানেই গড়ে উঠেছে প্রতিবাদের ঢেউ।
একদিকে পার্কিং লটে মুখোশ পরা অভিবাসন পুলিশের (আইসিই) সদস্যদের গালাগাল করছেন যোগব্যায়ামের পোশাক পরা এক শ্বেতাঙ্গ নারী, অন্যদিকে এক ক্যাথলিক পোপ অভিবাসীদের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন, নাগরিক সমাজ, এমনকি অঙ্গরাজ্য সরকার পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করছে। আদালতগুলো একের পর এক রায়ে প্রশাসনকে তিরস্কার করছে। সিনেটে কেউ টানা ২৫ ঘণ্টা বক্তৃতা দিচ্ছেন, কেউ সংবিধানের লঙ্ঘনের প্রতিবাদে মধ্য আমেরিকায় উড়ে যাচ্ছেন।
আন্দোলনের ঢেউ
১৮ অক্টোবর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দিন। ডেমোক্র্যাটদের বড় শহর ও রিপাবলিকানদের ছোট শহর মিলিয়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন “রাজা চাই না” স্লোগান নিয়ে। এটি ছিল ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় গণজোয়ার।
বছরের শুরুতে টেসলার সামনে প্রতিবাদ হয়, যেখানে ইলন মাস্কের কোম্পানিকে অভিযুক্ত করা হয় প্রশাসনের সঙ্গে একযোগে কাজ করার অভিযোগে। এই আন্দোলনের প্রভাবে টেসলার বিক্রি কমে যায়, এবং মাস্ক নিজেই সরকারি চুক্তির পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

রাস্তায়, আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদমাধ্যমে—সবখানেই গড়ে উঠেছে প্রতিবাদের ঢেউ। ছবিঃ রয়টার্স
সরকারি কর্মকর্তারাও নীরব প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছেন। কেউ আইনের প্রতি নিষ্ঠা বজায় রেখে, কেউ সত্য প্রকাশ করে, কেউ বা পদত্যাগ করে। গত আগস্টে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) কর্মীরা ওয়াকআউট করেন, কারণ তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টিকাবিরোধী নীতির প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন।
সংহতির হাতছানি
অভিবাসী, শরণার্থী ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদে নাগরিকদের মধ্যে গভীর সংহতি তৈরি হয়েছে। স্কুল, আদালত, বাজার কিংবা পাড়ার চায়ের দোকান, সবখানেই মানুষ প্রতিবাদী। অনেকে অভিবাসীদের সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ কেউ আদালতে তাঁদের সঙ্গে যাচ্ছেন। পোর্টল্যান্ড, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো ও ওয়াশিংটনে প্রতিদিনই স্থানীয় আন্দোলন হচ্ছে।
শিকাগোয় সাধারণ মানুষ তাঁদের অবসর সময় কিংবা ছুটি নিয়ে ‘র্যাপিড রেসপন্স’ টিম গঠন করেছেন। তাঁরা রাস্তায় নজর রাখেন, ফেডারেল এজেন্টদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন, হুমকির আশঙ্কায় দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠান। কেউ লন্ড্রি বা পানশালায় বাঁশি বাজিয়ে মানুষকে সতর্ক করেন।
চার্চ ও ধর্মীয় নেতাদের অবস্থান
ক্যাথলিক চার্চও এবার মাঠে নেমেছে। যারা চার্চে আসতে ভয় পাচ্ছে, তাদের প্রতিনিধিত্ব বোঝাতে বেঞ্চে কার্ডবোর্ড দিয়ে তাদের প্রতিকৃতি বসানো হয়েছে। মিডওয়েস্টের কয়েকটি গির্জায় এভাবেই ‘অদৃশ্য উপস্থিতি’র প্রতিবাদ চলছে। শিকাগোয় জন্ম নেওয়া পোপ লিও চতুর্দশ অভিবাসীদের পক্ষে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন।
এমনকি অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতারাও একসঙ্গে হয়েছেন। দুই শতাধিক পাদ্রি স্বাক্ষর করেছেন এক খোলা চিঠিতে, যার শিরোনাম “ব্রডভিউতে যিশুর ওপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হচ্ছে।” দেশজুড়ে কয়েকটি শহর নিজেদের “আশ্রয়কেন্দ্র নগরী” ঘোষণা করেছে, যেখানে আইসিইর সহায়তা না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরের প্রতিরোধ
শুধু নাগরিক সমাজ নয়, প্রশাসনের ভেতরেও চলছে নীরব বিদ্রোহ। রিপাবলিকান তহবিল সংগ্রাহক মাইলস ব্রুনার নিজের পদ ছাড়ার সময় লিখেছেন, “আমি এমন এক দলে কাজ করতে পারি না, যা ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী সংগঠনে পরিণত হচ্ছে।”
মেরিন কর্নেল ডগ ক্রুগম্যান ওয়াশিংটন পোস্টে লিখেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবিধান পরীক্ষা করছেন, কত দূর পর্যন্ত তিনি সেটিকে উপেক্ষা করতে পারেন।” একইভাবে দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌবাহিনীর এক অ্যাডমিরালও হঠাৎ পদত্যাগ করেন, ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ক্যারিবীয় সাগরে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সাবেক সেনাদের সংগঠন এবাউট ফেইস স্বাধীনতা দিবসে একটি নতুন প্রচারণা শুরু করেছে, যার লক্ষ্য বেআইনি আদেশ প্রত্যাখ্যানকারী সেনাদের পাশে দাঁড়ানো।
সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতেও প্রতিবাদ
অহিংস বর্জন আন্দোলনও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। টেসলা, টার্গেট ও ডিজনির বিরুদ্ধে বয়কট প্রচারণা বাস্তবিক প্রভাব ফেলেছে। স্পটিফাইয়ে আইসিইর বিজ্ঞাপন চালানোর প্রতিবাদে ‘ইনডিভিজিবল’ নামের সংগঠন বর্জন কর্মসূচি চালাচ্ছে। এমনকি জনপ্রিয় লেটনাইট হোস্ট জিমি কিমেল ডানপন্থী কর্মী চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করায় চাকরি হারিয়েছেন।
অন্যদিকে, কিছু আইনি প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত হওয়ায় বহু আইনজীবী পদত্যাগ করেছেন। অনেক সাংবাদিকও বড় সংবাদমাধ্যম থেকে সরে গিয়ে স্বাধীন প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করেছেন। বিকল্প গণমাধ্যমগুলো এখন তথ্য ও সংহতির প্রধান উৎস হয়ে উঠছে।

ট্রাম্পের সফর ঘিরে লন্ডনজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
আন্দোলনের পরিধি ও ভবিষ্যৎ
ট্রাম্প প্রশাসনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইনডিভিজিবল ও ৫০৫০১-এর মতো সংগঠনগুলো দ্রুত বেড়ে উঠছে। এগুলো স্থানীয় পর্যায়ে আন্দোলন সংগঠিত করছে, ভোটারদের সচেতন করছে এবং গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান জানাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এসব সংগঠনকে ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ বললেও, বাস্তবে মানবাধিকার, আইনের শাসন, সংবিধান, ভোটাধিকার ও স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি যারা বিশ্বাসী, তারাই এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি।
এক বছরের মাথায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতা এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। নাগরিক থেকে কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী থেকে পাদ্রিসবাই কোনো না কোনোভাবে প্রতিরোধের অংশ হয়ে উঠেছেন। কেউ বিক্ষোভে, কেউ আদালতে, কেউ কীবোর্ডে, কেউ কলমে।
এই প্রতিরোধ শেষ হবে কি না, তা এখনো অজানা। কিন্তু রাস্তায়, আদালতে এবং জনতার কণ্ঠে যে প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তা বলছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে নাগরিক প্রতিরোধের শক্তির ওপর।
মূল লেখক: রেবেকা সোলনিট, কলামিস্ট, দ্য গার্ডিয়ান; অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা