চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ১৭ নভেম্বর- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সাবেক প্রধানমন্ত্রী এমন অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের রায়ের মুখোমুখি হচ্ছেন। পুরো দেশজুড়ে এখন নজর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে। জুলাইয়ের গণহত্যার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী সাজা পাচ্ছেন, তা ঘিরে জনমনে নানা জল্পনা চলছে।
রায়কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট এলাকা ও ট্রাইব্যুনালে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। রোববার সন্ধ্যার পর থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে দোয়েল চত্বর হয়ে শিক্ষা ভবনমুখী সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পথচারীর চলাচলেও সীমিত নিষেধাজ্ঞা চলছে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, সোমবার বেলা ১১টায় বিচারকাজ শুরু হবে। চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করবেন।

কয়েকদিনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
এই মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। মামুন রাজসাক্ষী হয়ে নিজের দুই সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তার শাস্তি কী হবে তা ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে হাসিনা ও কামালের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে। হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আমির হোসেন দাবি করেছেন, ন্যায়বিচার হলে তারা খালাস পাওয়ারই যোগ্য।
সরকার জানিয়েছে, রায় ঘোষণা সরাসরি জাতিকে দেখানো হবে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বড় পর্দা বসানোর প্রস্তুতি চলছে। প্রসিকিউশন বলেছে, বিচারকাজকে স্বচ্ছ রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রায় বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি তাদের নেওয়া আছে।
হাসিনা, কামাল ও মামুনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগ উসকানি দেওয়া। গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্র জনতাকে রাজাকার বলে আখ্যা দেন শেখ হাসিনা। ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ভিসি মাকসুদ কামালকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়নের নির্দেশ দেন। ১৮ জুলাই তৎকালীন দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে ফোনে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার কথাও উঠে আসে তদন্তে। ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয়ের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও অভিযোগের অন্তর্ভুক্ত। প্রসিকিউশন দাবি করেছে, এসব নির্দেশের পর দেশজুড়ে ১৪০০ ছাত্র জনতা নিহত হন এবং কয়েক হাজার আহত হন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
তৃতীয় অভিযোগ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনা। চতুর্থ অভিযোগ চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যা এবং পঞ্চম অভিযোগ আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, পাঁচটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে তারা প্রমাণ করতে পেরেছে। সেইসঙ্গে আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে শহীদ ও আহত পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আবেদনও করা হয়েছে।
মোট ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। এরপর ৯ কার্যদিবস ধরে চলে প্রসিকিউশন এবং স্টেট ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক। ২৩ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেলের যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযোগ দায়ের হয়। দুই মাস পর তদন্ত শুরু করে সংস্থা। জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে দেশজুড়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। ১২ মে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। এরপর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তথ্যসূত্র, জব্দ তালিকা, দালিলিক প্রমাণ এবং শহীদদের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৩ আগস্ট প্রথম সাক্ষী হিসেবে হাজির হন খোকন চন্দ্র বর্মণ, যিনি নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দেন। ৫৪তম সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরের জেরা শেষে সাক্ষ্যপর্ব শেষ হয়।
সাতজন চাক্ষুষ সাক্ষী, আহত দুইজন, ভুক্তভোগী পরিবারের আটজন, আন্দোলনকারী সাতজন, চিকিৎসক তিনজন, সাংবাদিক একজনসহ মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। রাজসাক্ষী চৌধুরী মামুন ৩৬ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুঃশাসনের নানা বিবরণ তুলে ধরেন। বিশেষজ্ঞ ও ফরেনসিক সাক্ষ্যও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
প্রসিকিউশন ৯০টি অডিও ভিডিও তথ্যচিত্র ও ৩৫টি বস্তুগত প্রমাণ আদালতে জমা দেয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে বাজানো হয়, যা মামলার যুক্তিতর্কে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ফোনালাপগুলো শুধুমাত্র একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ভেরিফিকেশন করায় আদালতে উপস্থাপিত ফোনালাপ গুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রায় ঘোষণার দিন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, দেশে যেই হোক, মানবতাবিরোধী অপরাধ করলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করাই ছিল তাদের অঙ্গীকার। এই রায় ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে তারা আশাবাদী।

১০ নভেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ছবিঃ সংগৃহীত
এদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ দুই দিনের দেশব্যাপী শাটডাউন ডেকেছে। দলের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নেতারা অজ্ঞাত স্থানে বসে সামাজিক মাধ্যমে বিবৃতি দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান বিবিসিকে বলেন, পরিস্থিতি ব্যবসা ও সমাজের জন্য ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি করছে। তার মতে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেশের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন এবং পোশাক খাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিচালিত প্রহসনের বিচার বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, তিনি কখনো নিরস্ত্র বেসামরিকদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেননি। তবে জুলাইয়ের একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপ, যা বিবিসি যাচাই করেছে, তাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তিনি বলেছেন, তাকে দেশে ফিরতে হলে অন্তত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। তার ভাষায়, ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের চেয়ে সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনায় নীরব থেকেছে। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন ভারত স্বীকৃতি দেবে না।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে বিচার হয়েছে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, আর আলোচনার বড় অংশই ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্তগুলোর ভিতরে থাকা অসংগতিগুলোকে ঘিরে। অভিযোগগুলো যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, অনেক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন সেখানে প্রয়োজনীয় প্রমাণের দৃঢ়তা ছিল না এবং তদন্তের ধাপগুলোও ছিল অসম্পূর্ণ। অভিযোগের সূত্র, সাক্ষীর নির্ভরযোগ্যতা এবং ঘটনার ধারাবিবরণীতে অসামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও বিচার দ্রুতগতিতে এগিয়েছে, যা ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। আদালতের কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব, প্রতিরক্ষা পক্ষকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, রাজনৈতিক চাপের সম্ভাবনা এবং প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বিচার প্রক্রিয়াটি যেন একটি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক মানদণ্ডগুলো পূরণ হয়নি। এই অবস্থায় পুরো বিচারটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচার ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
লন্ডনের ফ্রন্টলাইন ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সিনিয়র কোর্টের সলিসিটর এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ সায়েদ জয়নাল আবেদিন বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। তিনি দাবি করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলো ভঙ্গ করে বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাঁর উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং এর পর গঠিত ইউনূস সরকারের অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যায় দখলদার প্রশাসন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় ICT-এর আইনে অতীতমুখী সংশোধন সংবিধান লঙ্ঘন করেছে এবং অভিযুক্তদের আইনজীবী বেছে নেওয়ার অধিকার, নিরপেক্ষ প্রসিকিউটর নিয়োগ ও ন্যায্য শুনানির সুযোগও খর্ব হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির পরিপন্থী।
সোমবারের রায় এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, দেশের ভবিষ্যৎ পথনির্ধারণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। পুরো দেশ তাকিয়ে আছে ট্রাইব্যুনালের দিকে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au