বিশ্ব

ভারত কেন শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না- আল জাজিরার বিশ্লেষণ

  • 5:59 pm - November 18, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৮৮ বার
ভারত কেন শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না- আল জাজিরার বিশ্লেষণ

মেলবোর্ন ১৮ ই নভেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়লেও, তিনি নিউ দিল্লিতে নিরাপদে অবস্থান করছেন। এমন বাস্তবতায় ভারত তাকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত কম।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিরোধীদলের ভূমিকায় থাকেন। এরপর ২০০৯-এ ক্ষমতায় ফিরে পরবর্তী ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়ে তার সরকারের অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্য তুলে ধরে তার সরকার জাতীয় অগ্রগতি সাধিত হয়। বাংলাদেশ গত এক দশকে ভারতের মাথাপিছু আয়ের চেয়েও বেশি অর্জন করে আঞ্চলিক অগ্রগতির আলোচনায় উঠে আসে।

৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা হঠাৎ করেই দেশ ছাড়েন এবং নিউ দিল্লিতে আশ্রয় নেন। তিনি বহু সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তিনি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেননি, এবং কোনও নথিতে ক্ষমতা ত্যাগের স্বাক্ষরও দেননি।

এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে শুরু করে, যা ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

ঢাকা সরকার এখন দিল্লিকে চাপ দিচ্ছে হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে—কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভারতের এতে আগ্রহ নেই।

এক্সট্রাডিশন চুক্তিতে ‘রাজনৈতিক মামলা’ ব্যতিক্রম: ভারত ব্যবহার করবে এই ধারা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে—ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর “বাধ্যবাধকতা” রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ এটিকে “অত্যন্ত অমিত্রতাপূর্ণ আচরণ” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আল জাজিরাকে বলেছেন—এ চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে:


‘যদি অভিযোগ ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক নয়।’

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক অধ্যাপক সঞ্জয় ভারদ্বাজ বলেন,
“ভারত এ মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফসল মনে করে। সুতরাং প্রত্যর্পণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”

ভারতের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার “স্পষ্টতই ভারতবিরোধী শক্তির” দ্বারা প্রভাবিত—এমন ভাবমূর্তি দিল্লিকে আরও সতর্ক করেছে।

ভারত যাকে শত্রু-মিত্র দেখে: ইউনুস সরকার বনাম হাসিনা

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নেতারা নিয়মিত ভারতের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত হাসিনার শাসনামলে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল ব্যতিক্রমীভাবে ঘনিষ্ঠ—নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক সংযোগ—সব ক্ষেত্রে দিল্লি ঢাকাকে তার অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার মনে করত।

এই বাস্তবতায় বিশ্লেষকরা বলছেন— হাসিনাকে ফেরত পাঠানো মানে ভারতবিরোধী শক্তিকে বৈধতা দেওয়া, যা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাপা প্রতিক্রিয়া

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেছে:

  • তারা রায়টি “নোট করেছে”
  • ভারত “গঠনমূলকভাবে সকল পক্ষের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে”
  • ভারত “বাংলাদেশের জনগণের শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি এবং স্থিতিশীলতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”

বিবৃতিটি পুরোপুরি নিরপেক্ষ এবং অ-বিতর্কিত, যা স্পষ্টভাবে দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান শীতল বাস্তবতাকে প্রকাশ করে।

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন:
“এ সরকারের অধীনে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণই থাকবে। তারা বারবার বলবে—ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না।”

কেন ভারত হাসিনাকে ফেরত দেবে না: ৫টি মূল কারণ

১. রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচিত—তাই প্রত্যর্পণের বাধ্যবাধকতা নেই

চুক্তিতে রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক নয়।

২. বর্তমান সরকারকে ভারত বিশ্বাস করে না

ইউনুস সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং ভারতকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

৩. হাসিনা ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র

২০০৯–২০২৪ সময়ে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল অভূতপূর্ব শক্তিশালী।

৪. মানবাধিকার উদ্বেগ

ভারতকে ফেরত দিলে এটি হবে এক প্রকার “মৃত্যুদণ্ডে ঠেলে দেওয়া”—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য।

৫. ইতিহাস, আবেগ ও দায়বদ্ধতার সম্পর্ক

১৯৭৫ সালের পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর ইন্দিরা গান্ধী তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।

হাসিনা: অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ

শেখ হাসিনা প্রথমবার দিল্লিকে ‘বাড়ি’ হিসেবে পান ১৯৭৫ সালে।
এরপর ছয় বছর সেখানে নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন।
২০০৯–২০২৪ মেয়াদের দীর্ঘ ক্ষমতাকালে তিনি সমালোচিত হলেও ভারতের কাছে ছিলেন নির্ভরযোগ্য মিত্র।

তিনি এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, দেশছাড়া, এবং রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা—তবুও ভারত তাকে ফেরত পাঠানোর পথে হাঁটবে না, বিশেষত বর্তমান সরকারের ওপর অবিশ্বাস থাকা অবস্থায়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন:
“হাসিনার উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের কাঁটা—কিন্তু একই সঙ্গে ভারত তার মিত্রকে রক্ষা করার নীতি থেকেও পিছিয়ে যাবে না।”

তিনি আরও মনে করেন যে দক্ষিণ এশিয়ার ‘ডাইনাস্টিক’ রাজনৈতিক দলগুলো কখনো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না; সময়ের প্রবাহে তারা আবার ফিরে আসার সুযোগ পেয়ে যায়।

এই শাখার আরও খবর

চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা

মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…

‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…

আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

এশিয়ান কাপ শেষে ইরানে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় নারী ফুটবলাররা, অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষার দাবি জোরালো

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ: ২০২৬ নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, ইরানি-অস্ট্রেলীয় কমিউনিটি এবং খেলোয়াড়দের অধিকার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au