ছবিঃ অ্যালফাবেটের প্রধান সুন্দর পিচাই বর্তমান এআই উত্থানকে ঘিরে কিছু “অযৌক্তিকতা” রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন। সংগৃহীত । বিবিসি নিউজ
মেলবোর্ন, ২০ নভেম্বর- বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ যে অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে, তা স্বীকার করেছেন গুগল প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই। তবে তিনি সতর্ক করছেন, এই উন্মাদনার মধ্যে স্পষ্ট কিছু অযৌক্তিকতা রয়েছে।এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এআই নিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক উত্তেজনা যেমন যৌক্তিক, তেমনি এর মধ্যে এমন কিছু প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য দ্রুত বেড়েছে। বড় বড় কোম্পানিও নতুন এআই প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঢালছে। সিলিকন ভ্যালিতে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই বিনিয়োগ বুদবুদের মতো ফুলে উঠছে এবং তা ফেটে গেলে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
এই বুদবুদ ফেটে গেলে গুগল কি এর প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে? পিচাই মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠানই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তার ভাষায়, “কোনো কোম্পানি এ থেকে মুক্ত নয়, আমরাও নই।” তবে তিনি বিশ্বাস করেন, গুগলের নিজস্ব প্রযুক্তিগত কাঠামো প্রতিষ্ঠানটিকে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রাখবে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলের সদর দপ্তরে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে পিচাই আরও বলেন, এআইয়ের বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধি শুধু বিনিয়োগ নয়, শক্তি ব্যবহার এবং পরিবেশগত লক্ষ্যেও প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১.৫ শতাংশ গেছে এআই খাতে। পিচাই সতর্ক করেন, এআই চালাতে যে শক্তি লাগে তা দ্রুত বাড়ছে, এবং নতুন শক্তি উৎস তৈরি না হলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমেই বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে এআই ব্যবসায় অ্যালফাবেটের শক্ত অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। গত সাত মাসে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। তাদের নিজস্ব সুপারচিপ প্রকল্প এনভিডিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ওপেনএআইকে কেন্দ্র করে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের জটিল চুক্তির বিষয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে সন্দেহ বেড়েছে, কারণ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশিত রাজস্ব সেই বিনিয়োগের তুলনায় খুবই কম।
এই পরিস্থিতিকে অনেকে নব্বইয়ের দশকের ডটকম বুদবুদের সঙ্গে তুলনা করছেন, যখন অতিরিক্ত আশাবাদী বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত বাজার ধস নামিয়েছিল। পিচাইও সেই তুলনার সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, “ইন্টারনেটেও অতিরিক্ত বিনিয়োগ হয়েছিল, কিন্তু আজ কেউ তার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এআইও একই পথেই যাবে।”
সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাজ্যে গুগলের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন। অ্যালফাবেট আগামী দুই বছরে দেশটিতে ৫ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করছে এবং ভবিষ্যতে তাদের এআই মডেল যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর এআই খাতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পিচাই স্বীকার করেন, এআইয়ের শক্তি চাহিদার কারণে গুগলের জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে। তবুও অ্যালফাবেট ২০৩০ সালের মধ্যে নিট শূন্য নিঃসরণ অর্জনের লক্ষ্যেই রয়েছে।
এআই চাকরির ধরনও পাল্টে দেবে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, এআই মানব ইতিহাসের “সবচেয়ে গভীর প্রযুক্তি”। তিনি বলেন, সমাজে পরিবর্তন আসবে, কিছু বিঘ্নও ঘটবে, তবে নতুন সুযোগও সৃষ্টি হবে। যেসব পেশাজীবী এআই ব্যবহার করতে শিখবেন তারাই সামনে এগিয়ে থাকবেন।
এআই বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্ছ্বাস ও উদ্বেগ দুই-ই বাড়ছে। সুন্দর পিচাইয়ের এই সতর্কতা সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সুত্রঃ বিবিসি