‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ২৬ নভেম্বর- বাংলাদেশে সম্প্রতি আহমদিয়া মুসলিম জামাতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণার দাবিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়েছে। ধর্মীয় উগ্রতা, রাজনৈতিক স্বার্থ ও সামাজিক বিভাজনের বিষয়গুলো মিলেই পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইতিহাসের নানা সময়ে যেমন সত্যের অনুসারীরা বিরোধিতা ও পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। তাদের ১৩৬ বছরের ইতিহাস নানা চ্যালেঞ্জ, আক্রমণ ও নির্যাতনে ভরপুর। তারপরও বিশ্বজুড়ে তাদের সম্প্রদায় বিস্তৃত হয়েছে এবং বহু দেশে শক্তিশালী সংগঠিত কাঠামো গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের আহমদিয়া জামাতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বাংলাদেশে আহমদিয়া জামাতের সূচনা ব্রিটিশ ভারতের সময়। স্থানীয় অনেক মানুষ হজরত মির্জা গুলাম আহমদকে মসিহ ও মাহদি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং কেউ কেউ কাদিয়ানেও গিয়েছিলেন। ১৯১৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেশের প্রথম আহমদিয়া মসজিদ নির্মিত হয়। স্বাধীনতার পর নানা ওঠানামার মধ্য দিয়ে সম্প্রদায়টি আজ হাজারো অনুসারী নিয়ে দেশে টিকে আছে।
বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে নানা বিরোধিতা হয়েছে। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, মসজিদে আগুন দিয়েছে এবং বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে।
রাজনৈতিক দল ও বিরোধিতার মূল উৎস
বাংলাদেশের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ধর্মভিত্তিক ও কঠোর অবস্থানের দল রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী দেশে আহমদিয়াদের প্রধান বিরোধী শক্তি। পাকিস্তান আমলে শুরু হওয়া তাদের আদর্শিক অবস্থান আজও বহাল আছে। ১৯৭১ সালে তারা পাকিস্তানের ঐক্যের পক্ষে ছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কিছু সময়ের জন্য নিষিদ্ধ হয়। পরে সামরিক শাসনের সময় তারা রাজনীতিতে ফেরে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে। কয়েকজন শীর্ষ নেতা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা পান এবং দলটির নিবন্ধন ২০১৩ সালে বাতিল হয়। তবে ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট আবার তাদের নিবন্ধন ফেরানোর নির্দেশ দেয়।
জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির এখনও সক্রিয় এবং সাম্প্রতিক ছাত্রলীগ-ভিত্তিক নির্বাচনে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।
আহমদিয়া বিরোধী প্রধান সংগঠন
আহমদিয়াদের বিরোধিতায় যেসব সংগঠন সবচেয়ে সক্রিয়:
এরা দীর্ঘদিন ধরে আহমদিদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা এবং মসজিদ-মাদ্রাসায় হামলার সঙ্গে জড়িত।
সাম্প্রতিক সহিংসতা
গত কয়েক বছরে আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে হামলা বেড়েছে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
আহমদিদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণার নতুন দাবি
দীর্ঘদিন ধরে উগ্রপন্থিরা দাবি করে আসছে যে পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও আহমদিয়াদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করতে হবে। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পরিবর্তনের পর এই দাবি আরও জোরালোভাবে সামনে আসে।
জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো বলছে, আগামী সংবিধান সংশোধনে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্বাচনে তাদের বিপুল সাফল্যও এই প্রচারে নতুন শক্তি জুগিয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকায় বড় সমাবেশ ডাকা হয়েছে যেখানে ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ, পাকিস্তান এবং আরব বিশ্বের আলেমদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (USCIRF) জানিয়েছে, হেফাজতে ইসলাম আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে ১৩ দফা দাবি তুলেছে। ভারতের কয়েকটি পত্রিকা লিখেছে, নতুন সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বেড়েছে এবং উগ্র গোষ্ঠীগুলো নির্ভয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিস্থিতি পাকিস্তানের ১৯৭৪ সালের পথের দিকে এগোচ্ছে। তখন পাকিস্তানে আহমদিয়াদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছিল এবং এরপর দেশটিতে উগ্রবাদ ও সামাজিক বিভাজন আরও বেড়েছিল।
রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে কঠিন পরীক্ষা
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কটের সামনে। রাষ্ট্র যদি ধর্মীয় উগ্রতার কাছে নতি স্বীকার করে, তবে দেশের মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করা।
আহমদিয়া জামাতকে প্রার্থনার আহ্বান
হযরত খলিফাতুল মসিহ পঞ্চম বিশ্বজুড়ে আহমদিদের আহ্বান জানিয়েছেন যেন বাংলাদেশসহ সব নির্যাতিত অঞ্চলের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। ২০২৫ সালের কয়েকটি খুতবায় তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের আহমদিদের জন্য দোয়া করুন। বিরোধীরা বড় অন্যায় উদ্দেশ্য নিয়ে এগোচ্ছে। আল্লাহ তাঁদের রক্ষা করুন।”
বাংলাদেশে ধর্মীয় সহনশীলতার যে পরিচয় বহু যুগ ধরে আছে তা আজ কঠিন পরীক্ষার মুখে। এখন প্রয়োজন শান্তি, দূরদর্শিতা এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান। নইলে আগামী প্রজন্ম এমন একটি দেশে বেড়ে উঠবে যেখানে ভিন্নমত বা ভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতাই নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক- শাহহুদ আসিফ, প্রভাষক জামিয়া আহমদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, ঘানা
মূল প্রতিবেদনঃ আল হাকাম; অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা
ডিসক্লেইমার: ওটিএন বাংলার মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখা, ছবি, কার্টুন, স্কেচ, অডিও বা ভিডিও- একান্তই এই লেখকের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। প্রকাশিত মতামত ওটিএন বাংলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au