মহানবীকে কটূক্তির অভিযোগে হিন্দু যুবক গ্রেপ্তার
মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে শ্যামল গাইন (২০) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার…
মেলবোর্ন, ২৭ নভেম্বর- আফগানিস্তানে তালেবান ফিরে আসার পর তাদের প্রভাব বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখল করলে বাংলাদেশের বহু তরুণ, বিশেষ করে মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামাজিক মাধ্যমে তাদের প্রশংসা করে। চা স্টল থেকে গ্রামাঞ্চলের আড্ডা পর্যন্ত অনেকেই বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিকে হারিয়ে তারা টিকে থাকায় মুসলমানদের জন্য এটি সম্মানের বিষয়। সে সময় পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কয়েকজন বাংলাদেশি আফগানিস্তানে গিয়ে তালেবানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
বাংলাদেশে তালেবানের প্রতি এই আগ্রহের শেকড় আরও পুরোনো। আশির দশকের শেষ দিকে কিছু তরুণ বাংলাদেশি সোভিয়েত দখলের বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধে লড়তে যান। তারা এটিকে মুসলিমদের পক্ষে এক ধরনের পবিত্র যুদ্ধ মনে করতেন। অনেকেই ফিরে আসেননি, আর যারা ফিরেছেন তারা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ আর মতাদর্শ নিয়ে দেশে ফেরেন। এরা পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইসলামী জঙ্গিবাদের ভিত্তি তৈরি করেন।
এই আফগানফেরতদের কয়েকজন ১৯৯২ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) গঠন করেন। দলটি দেশে একাধিক বোমা হামলা ও টার্গেট কিলিং করে। তাদের স্লোগান ছিল, “আমরা সবাই হব তালেবান, বাংলা হবে আফগানিস্তান।” অর্থাৎ তালেবানকে তারা রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখত। এই ভাবধারার কিছু অংশ এখনো তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
তবে বিষয়টি শুধু জঙ্গিবাদে সীমাবদ্ধ নয়। গত ২০ বছরে মাদরাসায় ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে, যা এক ধরনের ধর্মীয় রক্ষণশীলতার উত্থানকে নির্দেশ করে। ২০২২ সালে আলিয়া মাদরাসায় চার মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী পড়েছে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কওমি মাদরাসাতেও ছাত্র সংখ্যা বাড়ছে। যদিও মাদরাসার এই বৃদ্ধি সরাসরি জঙ্গিবাদের সাথে সম্পর্কিত নয়, তবুও ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হয়।
অন্যদিকে তালেবান নিয়ে ভয়ও আছে। অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে হলে নারীর শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প স্বাধীনতা সব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তালেবানের নারীবিরোধী নীতি অনেকের চোখে সতর্কবার্তা।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া বিদ্রোহে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর রাজনীতিতে তৈরি হওয়া শূন্যতায় বিভিন্ন ইসলামপন্থি দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খিলাফত মজলিস আবারও শক্তি সঞ্চয় করছে। তারা সরাসরি তালেবানের নাম না বললেও তাদের সমর্থকদের একাংশ তালেবানকে আদর্শ মানে। এমনকি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খিলাফত মজলিসের নেতা মামুনুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তালেবানের আমন্ত্রণে আফগানিস্তান সফরও করে।
এখন এই ইসলামপন্থি দলগুলো রাজনৈতিক সংস্কারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তারা অনুপাতভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা দাবি করছে, যা কার্যকর হলে তাদের ছড়ানো জনসমর্থন সংসদে বড় আসনে পরিণত হতে পারে। নারীর অধিকারকর্মী আর মানবাধিকার সংগঠনগুলো এতে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ লিঙ্গসমতায় দক্ষিণ এশিয়ার সেরা অবস্থানে থাকলেও এসব দল প্রভাব বাড়ালে অর্জনগুলো হুমকির মুখে পড়তে পারে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোরও দুশ্চিন্তা আছে। অতীতে বাংলাদেশে রমনা বোমা হামলা, ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলা এবং ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান হামলার মতো বড় ঘটনা ঘটেছে। আজও কিছু তরুণ তালেবানের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে। সংগঠিত সম্পর্ক না থাকলেও তালেবানকে শক্তিশালী শাসকের প্রতীক হিসেবে দেখায় চরমপন্থার ঝুঁকি বাড়ছে।
আন্তর্জাতিকভাবে এ প্রবণতা বাংলাদেশের সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। কোনো চরমপন্থার ইঙ্গিত বিদেশি অংশীদারদের উদ্বিগ্ন করতে পারে।
তবে তালেবানপ্রীতি পুরো দেশের অবস্থান নয়। ২০২৪ সালের বিদ্রোহ ছিল ছাত্রদের ন্যায়বিচারের আন্দোলন। শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশ এখনো সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে। তাদের কাছে তালেবান একটি সতর্ক বার্তা, কোনো আদর্শ নয়।
বাংলাদেশের যে অংশে তালেবান জনপ্রিয়তা পেয়েছে তা মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ থেকে। দুর্নীতি, পরিচয়ের দোলাচল আর ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের প্রতি হতাশা এই মনোভাবকে বাড়িয়েছে। ফলে তালেবান একদিকে গর্বের প্রতীক, অন্যদিকে ভয় ও অস্থিরতার ছায়া হয়ে আছে বাংলাদেশের এক অংশের কাছে।
লেখক- স্যাকলাইন রিজভী একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ এবং অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে লেখালেখি করেন।
মূল প্রতিবেদনঃ দ্য ইন্টারপ্রেটার; অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au