ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩ ডিসেম্বর- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বিজয় দিবস উপলক্ষে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ডিসেম্বরের শুরুতে দেওয়া ওই পোস্ট নিয়ে ফেসবুকে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক হয়েও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভুলভাবে বা অসম্পূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন।
জুমা তার পোস্টে ডিসেম্বরকে বিজয়ের মাস হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি লেখেন, ডিসেম্বর আমাদের বিজয় ও আত্মপরিচয়ে ফিরে দেখার মাস। ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে টিপু সুলতান, তিতুমীর, রজব আলী হাবিলদার, মঙ্গল পান্ডে, রানি লক্ষ্মীবাইসহ অসংখ্য শহীদের সংগ্রাম উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, তাদের দুই শ বছরের লড়াইয়ের ফলেই এসেছে ১৯৪৭ সালের ‘বিজয়’। তার মন্তব্যে তিনি বলেন, বিভাজনের পরপরই এই অঞ্চলে নতুন শাসনের নামে নতুন শোষণ নেমে আসে, সেখান থেকেই জন্ম নেয় বাঙালির রাষ্ট্রচেতনা। এরপর শুরু হয় নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যেখানে অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের ত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে স্বাধীন দেশ।

মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবস নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া জুমার পোস্ট। ছবিঃ ফেসবুক
পোস্টের শেষদিকে জুমা অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পরেও রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রূপ তৈরি হয়নি। স্বৈরাচার, দুর্নীতি, দুঃশাসন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নিপীড়ন এসব কারণে দেশ বারবার আঘাত পেয়েছে। তিনি লেখেন, ২০২৪ আমাদের সামনে আরেকটি সুযোগ এনে দিয়েছে রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ার। যারা আবার বিশ্বাসঘাতকতা করছে, ইতিহাস একদিন তাদেরও কঠোর বিচার করবে। মহান বিজয়ের মাসের শুরুতে তিনি সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এই পোস্টটিই মূলত সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক শুরু করে। অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগ করেন, তিনি কোথাও পাকিস্তান, মুক্তিযুদ্ধ, জামায়াতে ইসলামী বা ১৯৭১ সালের প্রকৃত প্রেক্ষাপটের সরাসরি উল্লেখ করেননি। তাদের মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি পোস্টে এসব শব্দ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মূল চরিত্রগুলোকেই আড়াল করেছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া মন্তব্য করেন, পাকিস্তান শব্দটি উল্লেখ করতে তার কেন সমস্যা হলো, সেই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে উঠছে। তিনি লেখেন, এতে মনে হচ্ছে কেউ কেউ সত্যিই ১৯৭১-এর ইতিহাসকে আড়াল করতে চাইছেন। আরেকজন ব্যবহারকারী তৃণ মন্তব্য করেন যে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক হয়েও তার লেখায় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি নেই।
জুমা সমালোচনার জবাবে বলেন, এগুলো ‘অতিরিক্ত যুক্তি’। তার বক্তব্য, তিনি পাকিস্তান বা মুক্তিযুদ্ধ শব্দ ব্যবহার করলেও সমালোচকরা সমালোচনা করতেন। আর ১৬ ডিসেম্বরের প্রসঙ্গে তিনি জানান, দিনটি তো মুক্তিযুদ্ধের বিজয়েই উপলক্ষ।
আরও একজন ব্যবহারকারী রিফাত মন্তব্য করেন, জুমা ‘সহস্র শহীদ’ এবং ‘সহস্র বোন’ শব্দ ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও বীরাঙ্গনার সংখ্যা হাজারের মতো দেখিয়েছেন, যা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তার মতে, পুরো লেখাটি পড়ে মনে হয় যেন মূল বিজয় ১৯৪৭ সালে হয়েছিল, ১৯৭১ সালে নয়।
পোস্টকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়ছে। সমালোচকরা বলছেন, দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন নেতৃস্থানীয় শিক্ষার্থীর কাছে তারা সঠিক ইতিহাস উপস্থাপনের প্রত্যাশা করেন। আর জুমা বলছেন, এসব সমালোচনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তার বক্তব্যকে বিকৃত করা হচ্ছে।