চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৯ ডিসেম্বর- শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও কূটনীতিক আমিনুল হক পলাশ প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন। তিনি নোবেলজয়ী ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে থাকা ক্ষমতার গোপন কাঠামো, আর্থিক নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক হিসাব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। নিউজ১৮-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরের নথি, গোপন তথ্য ও নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এমন একটি ছবি তুলে ধরেছেন, যা বিশ্ব আগে কখনো শোনেনি।
সাক্ষাৎকারে প্রথমেই তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কীভাবে তিনি নির্বাসনে যেতে বাধ্য হলেন। পলাশ বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি যে বিদেশে বসে নিজেরই কর্মস্থল হিসেবে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পতন নিয়ে কথা বলতে হবে। প্রায় এক দশক তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রসেবায় কাজ করেছেন। তার দায়িত্ব ছিল প্রমাণ অনুসরণ করা, রাষ্ট্রকে রক্ষা করা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু তিনি যখন ইউনূসের নেটওয়ার্কের আর্থিক প্রবাহ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সিস্টেমের ভেতরের কিছু মানুষ তাকে সাবধান করে দেন যে, তিনি এমন জায়গায় হাত দিয়েছেন যেখানে কারো যাওয়ার অনুমতি নেই। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় আসার পর তাকে ঘিরে চাপ আরও বাড়তে থাকে। গোয়েন্দা মহলের সহকর্মীরা জানান, তার নাম এমন সব বৈঠকে ঘুরছে যেখানে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। “নিষ্ক্রিয় করে দাও” বা “গায়েব করে দাও” ধরনের কথাও উঠছিল, আর এতে তার পরিবারও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এরপর ভারত থেকে কূটনৈতিক পোস্টিং হঠাৎ প্রত্যাহার করা হয়। সেটিই ছিল ইঙ্গিত যে দেশে ফেরার মানেই মৃত্যুর দিকে হাঁটা। তাই নির্বাসন ছিল বাঁচার একমাত্র পথ।
সাক্ষাৎকারে তাকে দেখানো নথিগুলো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই দলিলগুলো মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে তৈরি প্রচলিত গল্পটিকে বদলে দেয়। এগুলো দেখায় যে ইউনূস মাইক্রোক্রেডিট আবিষ্কার করেননি, বরং অন্যদের তৈরি ধারণা নিয়ে তা নিজের নামে প্রচার করেছেন। জোবরা গ্রামে গ্রামীণ ঋণ প্রকল্প ছিল ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, যা তৈরি করেছিলেন তরুণ গবেষকেরা — স্বপন আদনান, নাসিরউদ্দিন, এইচ আই লতিফী। তখন ইউনূস সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সেকশন দেখতেন। সময়ের সাথে সাথে সব নাম ইতিহাস থেকে মুছে যায়, আর গল্প দাঁড়ায় যে ইউনূসই মাইক্রোক্রেডিটের উদ্ভাবক। পলাশের মতে, এখান থেকেই শুরু হয় পরবর্তী পুরো সিস্টেম। প্রথম ধাপ ছিল অন্যের কাজ নিজের বলে দাবি করা, আর এই ধারা আর কখনো থামেনি।
বিশ্ব তাকে মানবতার রোল মডেল হিসেবে দেখে। পলাশ বলেন, ভেতর থেকে যা দেখা গেছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। “বিশ্ব একজন সাধুকে দেখে, বাংলাদেশ দেখেছে এক জটিল কাঠামো। এমন একটি কাঠামো, যা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, সরকারি অর্থকে ব্যক্তিগত চ্যানেলে প্রবাহিত করা এবং জবাবদিহিকে দূরে সরিয়ে রাখার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।” তিনি জানান, গ্রামীণ ব্যাংক সামাজিক উন্নয়ন তহবিল তৈরি করেছিল, যা পরে নীরবে সরিয়ে নেওয়া হয় গ্রামীণ কল্যাণ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। সেখান থেকে তৈরি হয় প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব মনে করে এগুলো আলাদা সংস্থা, কিন্তু পলাশের দাবি, সব সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণেই ফিরে আসত। ২০২২ সালেই গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণফোন থেকে ১০ হাজার ৮৯০ কোটি টাকার বেশি লভ্যাংশ পেয়েছে, অথচ যেসব শ্রমিক আইনি অধিকার অনুযায়ী এ অর্থের অংশীদার, তারা বছরের পর বছর কিছুই পায়নি। পুরো বিষয়টিকে তিনি এক ধরনের করপোরেট প্রকৌশল মনে করেন, যা দারিদ্র্য দূরীকরণের ভাষায় আড়াল করা হয়েছে।
টাকা অনুসরণ করতে গিয়ে তাকে সবচেয়ে বেশি চমকে দেয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, ব্যাপকতা ও কৌশলগত প্রয়োগ। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গ্রামীণ কল্যাণ ৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা গ্রামীণ টেলিকমে স্থানান্তর করে লভ্যাংশ নিশ্চিত করে। সেই অর্থই বহু বছরের ব্যবধানে ২ হাজার ২২২ কোটির বেশি লাভ তৈরি করে। কিন্তু প্রকৃত উপকারভোগী গ্রামীণ ঋণগ্রহীতারা এক টাকাও পাননি। শ্রমিকদের ৪৩৭ কোটি টাকার যে সমঝোতার কথা বলা হয়েছিল, তাতেও বিশাল অঙ্ক রহস্যজনকভাবে আইনজীবী ও কয়েকজন ইউনিয়ন নেতার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে চলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার পর এবং হাইকোর্ট এটিকে সন্দেহজনক লেনদেন বলার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
কর ফাঁকির প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইউনূস প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পদ নিজ নিয়ন্ত্রিত ট্রাস্টে স্থানান্তর করেন, কিন্তু সেগুলোকে ‘ঋণ’ দেখান যাতে কর দিতে না হয়। এসব মামলায় বারবার আদালতে গিয়ে হেরে যান এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার কর বকেয়া রয়েছে, যা আটকে রাখতে অসংখ্য মামলা করা হয়েছিল।
শ্রমিকদের মামলা ছিল বড় টার্নিং পয়েন্ট। তিনি বলেন, যে মানুষকে দরিদ্রদের ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, তার নিজের প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন মানা হয়নি। বহু শ্রমিক ন্যায্য সুবিধা পাননি, অনেকে অন্যায়ভাবে ছাঁটাই হয়েছেন। শ্রম আদালত বহু শুনানি শেষে প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ড দেয়। কিন্তু ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর সেই দণ্ড রাতারাতি উধাও হয়ে যায়।
৪৩৭ কোটি টাকার শ্রমিক সেটেলমেন্ট কেলেঙ্কারি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি দেখায় পুরো সিস্টেম কীভাবে কাজ করে। শ্রমিকদের লভ্যাংশের কথা বলা হলেও অর্থের বড় অংশ গোপনে অন্যদিকে সরানো হয়। তদন্ত চলার মাঝেই অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে, আর পুরো প্রক্রিয়াই থেমে যায়।
২০০৬-০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিদেশ থেকে ড. ইউনূস যে বিপুল রেমিট্যান্স পেয়েছিলেন, পলাশের মতে এটি দেখায় তার রাজনৈতিক পরিকল্পনা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। প্রায় ৪৮ কোটি টাকা তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আসে ঠিক সেই সময়, যখন তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসব অর্থের বড় অংশ কর কর্তৃপক্ষের কাছে সঠিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। শ্রম আদালতের দণ্ড, দুর্নীতির মামলা, আরও পাঁচটি শ্রম মামলা, এমনকি গ্রামীণ দইয়ের খাদ্য ভেজাল মামলা পর্যন্ত হঠাৎ বাদ পড়ে যায়। গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার কর বকেয়া রহস্যজনকভাবে মাফ হয়। গ্রামীণ ব্যাংক পায় পাঁচ বছরের জন্য পূর্ণ কর ছাড়।
সমালোচকেরা যে অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার আত্মীয়প্রীতি ও নিজস্ব নেটওয়ার্কে ভরা, পলাশের মতে সেটিই হলো সিস্টেমের মূল কাঠামো। ইউনূসের ভাতিজা অপূর্ব জাহাঙ্গীর হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি হন। তার ঘনিষ্ঠ সহকারী লামিয়া মরশেদ গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সংক্রান্ত দায়িত্ব পান। গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট বহু ব্যক্তি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান।
পাশ্চাত্য এখনও কেন এটি দেখতে পাচ্ছে না, এমন প্রশ্নে পলাশ বলেন, বিশ্ব এক গল্পে বিশ্বাস করতে চায়। এক বিনয়ী অধ্যাপক, নোবেল পুরস্কার আর গ্রামের নারী। সেই গল্প এতটাই আরামদায়ক যে আর কেউ প্রশ্ন করে না। কিন্তু গল্প আদালতের রায় বদলায় না, কর বকেয়া মেটায় না, কিংবা উধাও হয়ে যাওয়া মামলার ব্যাখ্যা দেয় না।
শেষে যারা এখনও ইউনূসকে সাধুর মতো ভাবেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তার বর্তমান ক্ষমতার ব্যবহার দিয়ে বিচার করুন, পুরোনো পদক দিয়ে নয়। যদি তিনি সত্যিই নিজের নাম পরিষ্কার রাখতে চান, তবে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণ অডিটে রাজি হোন। তার প্রতিষ্ঠান, আর্থিক লেনদেন ও বাতিল হওয়া প্রতিটি মামলার ফরেনসিক তদন্ত হোক। কিছু লুকোনোর না থাকলে ভয়েরও কিছু নেই। বাংলাদেশ পরিষ্কার উত্তর পাওয়ার যোগ্য, আর বিশ্বও সত্য জানার যোগ্য।
সূত্রঃ নিউজ১৮
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au