টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব পাবলিক পলিসির অধ্যাপক কাজুতো সুজুকি.। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৪ ডিসেম্বর- টোকিও ইকোনমিক সিকিউরিটি ফোরামের আগে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঘিরে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, জাপানের কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে এসেছে দ্য ইয়োমিউরি শিম্বুনকে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে।
এসব সাক্ষাতকারে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখন আর আলাদা কোনো বিষয় নয়; এটি সরাসরি প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব পাবলিক পলিসির অধ্যাপক কাজুতো সুজুকি বলেন, জাপানের প্রবৃদ্ধি কৌশলের একটি প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
তার মতে, বিরল খনিজ বা কৌশলগত উপকরণ রাতারাতি উৎপাদন বা সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিনিয়োগের ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং জাতীয় দুর্বলতা কমানো জরুরি।
সুজুকি বিশেষভাবে ‘অপরিহার্যতা’ ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘জাপানকে এমন পণ্য ও প্রযুক্তি উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে, যেগুলো অন্য দেশ সহজে তৈরি করতে পারে না।’
“এর মধ্যে রয়েছে উন্নত কাঁচামাল, মেশিন টুল, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন যন্ত্রপাতি ও সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ। র্যাপিডাস করপোরেশনের পরবর্তী প্রজন্মের ‘বিয়ন্ড ২ ন্যানোমিটার’ সেমিকন্ডাক্টর যদি দেশে সফলভাবে গণউৎপাদন করা যায়, তাহলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় জাপানের গুরুত্ব আরও বাড়বে।”
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নে অধ্যাপক সুজুকি বলেন, প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এমন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা প্রয়োজন, যেখানে দেশগুলো একে অপরের দুর্বলতা পূরণ করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জাহাজ নির্মাণ শিল্পের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারিয়েছে। এই খাতে জাপান সহযোগিতার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে সহায়তা করতে পারে। একইভাবে বাণিজ্যিক ড্রোন বাজারে চীনের আধিপত্য মোকাবিলায় জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় জাপানের ভূমিকা প্রসঙ্গে সুজুকি জানান, গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সুরক্ষা ও তথ্য বিনিময়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাপানের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। টোকিও ইকোনমিক সিকিউরিটি ফোরামের মতো আয়োজনের মাধ্যমে জাপান তার উদ্যোগগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চায়।
তার প্রত্যাশা, এই ফোরাম একদিন এশিয়া সিকিউরিটি সামিট বা দাভোসের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতো একটি প্রভাবশালী মঞ্চে পরিণত হবে।
এদিকে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নীতির জটিল দিকগুলো তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইকোনমিক সিকিউরিটি অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের সভাপতি নাভিন গিরিশঙ্কর।
তিনি বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চারটি বড় ধাক্কা এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন ও ডাম্পিং, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি নিয়ে নতুন উদ্বেগ, মেধাস্বত্ব চুরি ও সাইবার হুমকি এবং উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একচেটিয়া অবস্থান হারানো।
গিরিশঙ্করের মতে, এসব পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্ব কখনো কখনো সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নীতিতে শুল্ক আরোপ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং মিত্রদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে, যা তিনি ‘ত্রিলেমা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি আরও বলেন, এই নীতিগুলোর স্বভাবগত কারণেই অর্থনৈতিক নীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য নীতির অস্থিরতা বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। তাই ভবিষ্যতে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যা একদিকে উদ্ভাবন ও গতিশীলতা বজায় রাখবে, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত সুবিধা সুরক্ষিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আর একক কোনো দেশের বিষয় নয়। সহযোগিতা, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক নির্ভরতার নতুন কাঠামো গড়ে তোলাই হবে আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ।