‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ১৬ ডিসেম্বর- আজ থেকে ৫৪ বছর আগে মধ্য ডিসেম্বরের এক কুয়াশা মোড়া ভোরে পৃথিবীর আকাশে উদিত হয়েছিল একটি দেশের স্বাধীনতার নতুন সূর্য। যে দেশের নাম ছিল বাংলাদেশ। এক নদী রক্তের চিহ্ন বুকে ধারণ করে গর্বভরে পতপত করে উড়েছিল সেই লাল-সবুজ পতাকা। সেদিন বাতাসে অনুরণন তুলেছিল অগণিত কণ্ঠের সুর ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ একই সাথে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বাংলা’ বলে। কোটি জনতা স্লোগান তুলেছিল, ‘আমার দেশ তোমার দেশ’, ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’।
বিজয়ের এই ক্ষণটি সেদিন একদিকে যেমন দেশের মানুষের কাছে এসেছিল চিরগৌরব ও আনন্দের হয়ে, তেমনি বিষাদে ছুঁয়ে গিয়েছিল স্বজন হারানোর বুকভাঙা আর্তনাদের আর বেদনায়। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর আর আল শামস বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধ করে বিজয় পেয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
দেশের অকুতভয় বীর সন্তানেরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্ষ। তবে তার জন্য বিশাল মূল্য চুকাতে হয়েছিল। প্রাণ দিতে হয়েছিল ৩০ লাখ মানুষকে। প্রায় ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর বিপুল সংখ্যক আহত-পঙ্গু মানুষের ত্যাগে অর্জি ত হয়েছিল চূড়ান্ত বিজয়। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছিল বাঙালি জাতি।
কিন্তু বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তির দিনে এসে বাংলাদেশের মানুষ দেখছে, সেই পরাজিত শক্তি আবারো জাতির পতাকা খামচে ধরেছে। লাখো শহীদের জীবনের বিনিময়ে পাওয়া দেশের আনাচে-কানাচে সেই পুরোনো শকুনের দল নৃত্য করছে। যে দিনটির জন্য বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল গর্ববোধ করে, সেইদিনে আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায় স্বাধীনতাবিরোধী চক্র।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ‘গণঅভ্যুত্থানে’র পর থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বেছে বেছে বসানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মনোভাবের মানুষকে। যারা সুকৗশলে একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-চিহ্ন ধ্বংস করছে, তেমনি মিথ্যাচার করে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করছে। নতুন নতুন অসত্য বয়ান তৈরি করছে হানাদার পাকিস্থানি এবং তাদের দোসরদের পক্ষে। অন্য দিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি, বাধ্যতামূলত অবসর, ওএসডি এবং দায়িত্বের বাইরে রেখে পুরো প্রশাসনকে পাকিস্থানপন্থী করে তোলা হয়েছে।
প্রশাসনে থাকা এসব ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে শুধু মিথ্যচারই করছে না, স্বাধীনতা দিবসের বহু অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে, অথবা নামমাত্র উদযাপন করেছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে ডিসেম্বর মাস মানেই বিজয়ের, গৌরবে। অন্য বছরগুলোতে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশব্যাপী শুরু হয় বিজয় উদযাপন প্রস্তুতি। বিশেষ করে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানসহ আরও বড় বড় অনেক অনুষ্ঠান থাকে। কিন্তু গত দুই বছর ধরে এই কুচকাওয়াজ বন্ধ করে রেখেছে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। কেন বন্ধ? সেই প্রশ্নের কোনো জবাব সরকার দেয়নি।

যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি মুছে দিয়েছে হল প্রশাসন। ছবি: সংগৃহীত
জাতির বিজয়ের মাস, গর্বের মাস; অথচ দেশে কোনো উদযাপন নেই। যেন শোকের মাস চলছে। চারিদিকে স্তব্ধ সবকিছু। সরকারের ভয়ে অনেকে সাহস করে বলতেও পারছে না স্বাধীনতার সেই গৌরবগাঁথা। গত বছরের চিত্রও ঠিক এমনই ছিল। নানান কৌশলে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বিজয়ের ইতিহাস। এমনকি যার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্ম হলো, সেই মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম পর্যন্ত কোথাও নেই!
এভাবেই একাত্তরের পরাজিত শক্তি আজ ‘বিকৃত নৃত্য’ করছে জাতির সামনে! যাদের একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান। সুপরিকল্পিতভাবে ইহিতাস বিকৃত করার মিশনে নেমেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল এ দাবি রীতিমতো অবান্তর। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পালানোর সময় পাকিস্তানি বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে-এমন ধারণা যুক্তিসংগত নয়।”
কত বড় ধৃষ্টতা! শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে যে আলোচনা সভা, সেখানেই এমন মিথ্যাচার করার সাহস সে কোথায় পায়? এখানেই থেমে থাকেনি মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান। তার আরও দাবি, “আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অন্য একটি দেশের করতরাজ্যে পরিণত করার জন্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। আমরা জাতির সামনে রেটরিক বক্তব্য চাই না। আমরা রিয়েলিটি চাই। ১৯৭১ সালে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, কারা শহীদ হয়েছেন, কারা হত্যা করেছে- এসব তথ্য আজও স্পষ্ট নয়।”
ইতিহাস বিকৃতির আরেক ঘটনা ঘটেছে পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ। সেখানে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীকে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ‘সূর্যসন্তান’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেটাও ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠানে। কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মামুন আল হাসান দুই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বলছে, জাতির সূর্য সন্তান!
মিথ্যাচারের এই লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও। তাদের কৌশলটা অবশ্য ভিন্ন। বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে জগন্নাথ হল সংসদের উদ্যোগে ‘চিত্র প্রদর্শনী ও তুলির সাহায্যে দ্রোহ প্রকাশ’ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে আঁকা যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী ও কাদের মোল্লার ছবি মুছে ফেলা হয়। এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলে জগন্নাথ হল প্রশাসন জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এসব ছবি মুছে দেওয়া হয়েছে।
অথচ একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে সবেচেয়ে বড় গণহত্যার শিকার হয়েছে জগন্নাথ হলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারিরা। তাদের স্মরণে আঁকা ছবিগুলো মুছে দেওয়ার ধৃষ্টতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখিয়েছে। হল প্রশাসনও সিকিউরিটি কনসার্নের দোহায় দিয়েছে। যেন মুক্তযুদ্ধ নিয়ে সব জবাবদিহিতার বাইর তারা।
তবে আশার কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির এসব ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করেছে শিক্ষার্থীরা। সরকারের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে। তার ওই বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে পুরো ক্যাম্পাস। নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে তার পদত্যাগের দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রদল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, বাংলদেশে ছাত্র ফেডারেশন, বাংলদেশে ছাত্র ইউনিয়ন ও নারী অঙ্গনের নেতাকর্মীরা।
একই রকমের প্রতিক্রিয়া হয়েছে পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজেও। ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মামুন আল হাসানের বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছে সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। এমনকি সেখানে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে জগন্নাথ হলে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী ও কাদের মোল্লার আঁকা ছবি মুছে ফেলার ঘটনাতেও। সারাদেশের মানুষ এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে এই ঘটনা ঘটনানো হয়েছে।
এই সময়ে আরেকটি ঘটনা মানুষকে অুনুপ্রণিত করেছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভে’ জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালন করেছে একদল শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। ১৪ ডিসেম্বর বেলা ১২টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া ভবনের সামনে একটি ঘৃণাস্তম্ভ তৈরি করে জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালন করা হয়। সেখানে জুতা নিক্ষেপ করতে আসা ব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন উপহার দিতেও দেখা গেছে।

ছবি: সংগৃহীত
ওই ঘৃণাস্তম্ভের পেছনে একটি দেয়ালে বেশ কিছু ছবি লাগানো হয়। যাদের মধ্যে ছিল মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদের ছবি, চৌধুরী মঈনুদ্দীন, অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনাকারী খাদিম হোসেন রাজা, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে গোলাম আযমের বৈঠকের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটক রাজাকার বাহিনীর ছবি।
কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার ‘বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’ কবিতায় লিখে গিয়েছেন,
‘‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরেৃ
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?”
কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ওটিএন বাংলাকে জানিয়েছে, বাঙালি বীরের জাতি। পাকিস্তানিদের দোসর রাজাকার, আলবদর আর আল শামস বাহিনীর উত্তরসূরিরা যতই চেষ্টা করুক, বাংলাদেশকে পরাজিত করতে পারবে না। জাতির পতাকা খামচে ধরলেও সেই পুরনো শকুনরা সফল হতে পারবে না। একদিন না একদিন আবার বাংলাদেশ পরিচালিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au