আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ১৮ ডিসেম্বর- খাতা–কলমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও বাস্তব চিত্র ছিল অনেক বেশি জটিল ও অস্থির। আত্মসমর্পণের পরও দেশের বহু এলাকা পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। কোথাও কোথাও পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, ফলে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। এসব সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে পুরো দেশে মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যায়।
এর মধ্যেই বিজয়ের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়। ১৭ ডিসেম্বর থেকে একের পর এক সংবাদ আসতে থাকে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার। শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসকসহ শত শত মানুষকে আত্মসমর্পণের ঠিক আগমুহূর্তে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান মেলে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সারা দেশে এগারো শতাধিক বুদ্ধিজীবী নিহত হন। শুধু ঢাকাতেই প্রায় দেড়শ জন বুদ্ধিজীবীর মরদেহ উদ্ধার হয়, যার বেশির ভাগই পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। সে সময় দৈনিক ইত্তেফাক এই হত্যাকাণ্ডকে মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে।

বধ্যভূমির পাশাপাশি গণকবরের খবরও দেশের মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। দৈনিক পূর্বদেশ তখন লিখেছিল, একদিকে স্বাধীনতার আনন্দ, অন্যদিকে লাখো মানুষের আত্মহুতি রক্তে ভিজিয়ে দিয়েছে দেশকে। এই শোক ও আতঙ্কের মধ্যেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে যায় আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণের পরও খুলনা অঞ্চলে পাকিস্তানি ১০৭ নম্বর ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান চার হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। মুক্তিবাহিনীর আট নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে যৌথ আক্রমণের মুখে ১৭ ডিসেম্বর খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। একইভাবে ১৭ ডিসেম্বর বাগেরহাট, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী ও রাঙামাটি, ১৮ ডিসেম্বর পাবনা, নওগাঁ, সৈয়দপুর ও রাজবাড়ী, ১৯ ডিসেম্বর ভৈরব ও ঈশ্বরদী, ২১ ডিসেম্বর নাটোর এবং ২৩ ডিসেম্বর কুমিল্লার হোমনা পুরোপুরি মুক্ত হয়।

পাকিস্তানি বাহিনীর পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে তাদের প্রশাসনিক কাঠামো। ফলে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল জরুরি ও কঠিন কাজ। মুজিবনগর সরকার আগেই এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচ টি ইমাম তাঁর বই ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’-এ লিখেছেন, আত্মসমর্পণের পর দ্রুত রাজধানী ঢাকায় সরকারের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়। তবে নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। প্রথমে সচিবরা, পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা ঢাকায় ফেরেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় দ্রুত ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপার নিয়োগ দিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে হাতে লেখা নির্দেশ পাঠিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করা হয়।
ঢাকা বিমানবন্দর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর ছোট ছোট দলে মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তারা দেশে ফিরতে থাকেন। অবশেষে ২২ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা ঢাকায় ফেরেন। তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। বিমানবন্দরেই দেওয়া ভাষণে শোষণহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেন তাঁরা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান।

২৩ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তান শব্দযুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক রাখা হয়। শহীদদের স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পুনর্নির্মাণ এবং নিহতদের পরিবারের সহায়তায় মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে নেওয়া সব পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা আয়োজনের ঘোষণাও আসে।
বিজয়ের পরদিন ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে মুক্তিবাহিনীর প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি না দিলে পাকিস্তানে আক্রমণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজাকার ও আলবদরদের শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হয়।
১৯ ডিসেম্বর থেকে সচিবালয়সহ সরকারি অফিস চালু হয়। এমনকি রোববারও অফিস খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রথম কর্মদিবসে সকাল সাড়ে সাতটায় কাজে যোগ দিতে বলা হয় কর্মকর্তাদের।

এদিকে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের ৪৮ ঘণ্টা পরও ভারতীয় সেনারা দেশে ফিরে না যাওয়ায় জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়। এ অবস্থায় মিত্রবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ঘোষণা দেন, নির্দিষ্ট দায়িত্ব শেষ হলেই ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশ ত্যাগ করবে। ডিসেম্বরের শেষদিকে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল শ্যাম মানেকশ ২৪ ঘণ্টার সফরে ঢাকায় এসে বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এই সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। পুলিশ বাহিনী কার্যত ভেঙে পড়েছিল। খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সংকটের মধ্যে চুরি, ডাকাতি ও লুটপাট বাড়তে থাকে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মুক্তিবাহিনীকে দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানায় সরকার। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় গুলি না চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও রাজাকার ও আলবদরদের বিরুদ্ধে গণপিটুনির ঘটনাও ঘটে, যা বন্ধ করতে সরকার আইনের পথে আসার আহ্বান জানায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে জাতীয় মিলিশিয়া বা আধা সামরিক বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁদের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সব মিলিয়ে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পরের দুই সপ্তাহ ছিল আনন্দ, শোক, অনিশ্চয়তা ও পুনর্গঠনের এক কঠিন সময়। খণ্ড যুদ্ধ, বধ্যভূমির ভয়াবহতা, প্রশাসনিক শূন্যতা আর বিদেশি সেনা উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অধ্যায় রচিত হয়েছিল।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au