গত ২ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থানের চার্চ ও কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ‘তৌহিদী মুসলিম জনতা’ পরিচয়ে হুমকিমূলক চিঠি পাঠানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২৫ ডিসেম্বর- খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বড়দিনকে সামনে রেখে সারা দেশে নানা ধর্মীয় আয়োজন চললেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একাধিক চার্চে ককটেল বিস্ফোরণ, উড়ো চিঠির মাধ্যমে হুমকি এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতারা।
গত ২ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থানের চার্চ ও কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ‘তৌহিদী মুসলিম জনতা’ পরিচয়ে হুমকিমূলক চিঠি পাঠানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঠিক এক মাস আগেই ঢাকার কয়েকটি চার্চ ও সেন্ট জোসেফ স্কুলসহ বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর পাশাপাশি ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী পোশাক শ্রমিককে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে বলে জানান খ্রিস্টান নেতারা।
খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিনিধিদের ভাষ্য, এসব ঘটনার বিচার বা কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় সংখ্যালঘু হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা শঙ্কা অনুভব করছেন। এ অবস্থায় হুমকি ও হামলার ঘটনার একটি তালিকা সরকারের স্বরাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়ে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু আর্চবিশপ বিজয় এন ক্রুজের প্রতিনিধি ফাদার আলবার্ট রোজারিও বিবিসি বাংলাকে বলেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে তারা নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়েছেন। তবে ধারাবাহিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। তার ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাড়া দিলেও যারা এসব ঘটনার মূল হোতা, তাদের এখনো শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে খ্রিস্টান চার্চকে কেন্দ্র করে একাধিক হামলা ও হুমকির অভিযোগ সামনে এসেছে। গত ৭ নভেম্বর রাতে ঢাকার রমনা এলাকায় সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রাল চার্চে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর দুই দিন পর ৯ নভেম্বর একই চার্চের ফটকে আবার ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। এর আগে ৮ অক্টোবর তেজগাঁওয়ের হলি রোজারি চার্চে দুটি ককটেল ছোড়া হয়। এসব ঘটনার পর ঢাকার আর্চবিশপ ও বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মিলনীর সভাপতি আর্চবিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল।
এ ছাড়া গোপালগঞ্জে চার্চের জমি দখলের চেষ্টা এবং চট্টগ্রামে ফিরিঙ্গি বাজার ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সামনে দীর্ঘদিন ধরে ময়লার ভাগাড় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ খ্রিস্টান যুব অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব শিমিয়ন জয় হাজরা জানান, গোপালগঞ্জের ঘোষের চর ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ও বেতগ্রাম চার্চের দখল হওয়া জমি উদ্ধারে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।
খ্রিস্টান নেতাদের দাবি, গত ২ ডিসেম্বর দেশের অন্তত ২১টি চার্চ ও ব্যক্তির কাছে ঠিকানাবিহীন উড়ো চিঠি পাঠানো হয়। কম্পিউটারে টাইপ করে প্রিন্ট করা ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, খ্রিস্টান চার্চগুলো মুসলমানদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করছে। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ না হলে খ্রিস্টান উপাসনালয়ে হামলার হুমকিও দেওয়া হয়।
ফাদার আলবার্ট রোজারিও জানান, উড়ো চিঠির বিষয়টি ধর্ম ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা মহানগর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে জানানো হয়েছে। বড়দিন উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা চেয়ে আর্চবিশপের পক্ষ থেকেও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্মল রোজারিও বলেন, চার্চে হামলা, উড়ো চিঠির হুমকি কিংবা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হত্যার মতো ঘটনাগুলো দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। তার মতে, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে একটি মহল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায় বা তাদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সাম্প্রতিক সময়ে হুমকি ও হামলার সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবে আগের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে ভালুকায় হিন্দু যুবককে হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়া স্বাভাবিক।
এদিকে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বড়দিনসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, বড়দিন উপলক্ষে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা ও উড়ো চিঠির পেছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, মন্তব্য বা ছবি ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে একটি মহল দীর্ঘদিন ধরেই অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বা হুমকির যেকোনো ঘটনা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি জানান, খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা