চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ২৭ ডিসেম্বর- ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ বৃহস্পতিবার দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে ঢাকায় ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী জিয়া পরিবারের ইতিহাসে শুরু হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হলে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নেতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস গঠনে জিয়া পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। সেই ইতিহাসের শেকড় গেঁথে আছে এক সেনা কর্মকর্তার উত্থান থেকে শুরু করে এক পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যে।
জিয়াউর রহমানের জন্ম ১৯৩৬ সালে তৎকালীন বগুড়া জেলায়। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার করাচিতে চলে যায়। ১৯৫৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং অ্যাবটাবাদের পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন। পাঞ্জাবি আধিপত্যের সেনাবাহিনীতে বাঙালি কর্মকর্তা হিসেবে বৈষম্যের শিকার হলেও দক্ষতা ও সাহসিকতার কারণে দ্রুত পদোন্নতি পান। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন এবং পুরো পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একমাত্র বাঙালি কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি হিলাল-ই-জুরআত পদকে ভূষিত হন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে অবস্থানরত অবস্থায় বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করে বাঙালি বিদ্রোহী সেনাদের নেতৃত্ব দেন। ২৭ মার্চ তিনি বেতারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যদিও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ঘোষণা দিয়েছেন বলে সংশোধন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি জেড ফোর্স নামে মুক্তিবাহিনীর একটি নিয়মিত ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেন এবং একাধিক সফল অভিযানের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে নিজের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃত না পাওয়ায় জিয়াউর রহমান অসন্তুষ্ট ছিলেন। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে সেনাপ্রধান না করায় সেনাবাহিনীতে বিভক্তি তৈরি হয়। একই সময় দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগে মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। যদিও জিয়াউর রহমান সরাসরি এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন না, তবে ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন বলে পরবর্তী তদন্ত ও সাক্ষ্যে উঠে আসে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান দ্রুত রাজনৈতিক সুবিধা পান। তিনি সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন এবং কয়েক দফা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কার্যত দেশের ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমে সামরিক শাসক, পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ শাসন করেন।
ক্ষমতায় এসে তিনি সংবিধানে পরিবর্তন আনেন। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন করেন এবং ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ যুক্ত করেন। অর্থনীতিতে তিনি বেসরকারিকরণ ও বাজারমুখী নীতির দিকে অগ্রসর হন। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তাঁর শাসনামলে কৃষি খাতে প্রণোদনা ও গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশংসিত হলেও বিরোধী দল দমন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুযোগ সৃষ্টি এবং মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা খাটো করার অভিযোগও রয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। এই সময়েই রাজনীতিতে সামনে আসেন জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া। আগে রাজনীতিতে অনাগ্রহী থাকলেও স্বামীর মৃত্যুর পর দলীয় নেতাদের অনুরোধ ও জনচাপের মুখে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারপারসন হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার সঙ্গে একসঙ্গে রাজপথে নামেন তিনি। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। পরে ২০০১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন।
খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে শিক্ষা সংস্কার, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং গ্রামীণ প্রশাসনিক কাঠামো জোরদারের উদ্যোগ প্রশংসা পায়। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে জামায়াতে ইসলামীসহ কট্টর ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠন এবং ভারতবিরোধী রাজনীতি জোরালো করার অভিযোগ ওঠে। এই সময় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপির পরাজয়ের পর দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকে দলটি। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও যুদ্ধাপরাধের মামলা হয়। খালেদা জিয়া ও তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা দায়ের হয়। তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে অবস্থান করেন।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি নতুন করে সক্রিয় হয়। অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়ার পক্ষে আর ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে দলের নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারেক রহমানের ওপর।
ঢাকায় ফিরে হাজারো নেতাকর্মীর সামনে তারেক রহমান নিজেকে রাষ্ট্রনায়কসুলভভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন এবং সব ধর্ম ও জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার কথা বলেন। তবে সাম্প্রতিক সংখ্যালঘু সহিংসতা ও অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর এই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
জিয়া পরিবারের ইতিহাস বলছে, এই পরিবারের প্রতিটি অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় শুরু হলো, যার পরিণতি নির্ধারিত হবে আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়েই।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au