‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন ২৭ ডিসেম্বর: বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর চলমান নির্যাতন কেবল একটি মানবাধিকার সংকট নয়; এটি অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের নির্বাচনী রাজনীতির একটি সচেতন উপাদানে পরিণত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামি, তাদের সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং উগ্র ছাত্র সংগঠনগুলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ও নির্বাচনী সাফল্যের সোপান হিসেবে। জনগণের সামনে তাদের আর কোনো কর্মসূচি নেই, আছে কেবল ধর্ম। ফলে ধর্মীয় মেরুকরণই হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান ভোটরাজনীতি।
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন উগ্রবাদী রাজনীতির গভীর পচনের প্রতিফলন। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ভারতবিরোধী বক্তব্য মিলিয়ে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। তথাকথিত ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব ও পরিবর্তনের স্লোগান ছিল কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জা। বাস্তবে এটি ছিল বাংলাদেশকে ভারতের উত্থানের বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী কাঁটা বানানোর সুপরিকল্পিত প্রয়াস।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে সামনে এনে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও শাসনব্যবস্থার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে ইউনূস সরকারের অধীনে দেশ কার্যত এক গভীর দুর্দশায় পড়েছে। তবুও জামায়াত ও তাদের মিত্ররা কেবল ধর্মীয় আবেগ উসকে দিয়েই ভোটের রাজনীতি করতে চাইছে।
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভোটগ্রহণের দিন ধার্য হয়। একই সঙ্গে ‘জুলাই চার্টার’ নামে একটি গণভোটের ঘোষণা দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন, যা নতুন হলেও এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
কিন্তু গোটা প্রক্রিয়াই এক প্রহসন বলে। নির্বাচন যেন আগে থেকেই নির্ধারিত একটি ‘ফিক্সড ম্যাচ’। হিন্দু যুবকের গণপিটুনি ও হত্যাই প্রমাণ করে, কীভাবে ভয় ও সহিংসতার আবহে এই ভোটের মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। আরও বহু হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্তই হয় না, কারণ সংবাদমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত।
বর্তমান রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামি কার্যত প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এনসিপি, যা শেখ হাসিনাকে উৎখাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, এখন গুরুত্বহীন। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। আদর্শ, উগ্রতা ও ধর্ম মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে তুলেছে।
এই অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব থাকা মানেই একটি অস্বচ্ছ ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। তিনি ইতোমধ্যে বন্দিদের মুক্তি, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মতো আচরণ করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।
হিন্দু সংখ্যালঘুরা এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। তাদের প্রতিদিনের জীবন ভয়ে আচ্ছন্ন, বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা ভয়াবহভাবে হুমকির মুখে। হিন্দুদের ‘ভারতের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা তাদের আরও টার্গেটে পরিণত করছে।
নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের জোটই এখন সবচেয়ে সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। অতীতে বিএনপি ইসলামপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলেছে। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও উগ্রবাদ দমন হবে না। বরং জামায়াত এবার সামনের সারিতে থাকবে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ফলে প্রকৃত বিরোধী শক্তি অনুপস্থিত থাকবে।
যদি বিএনপি শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ায়, জামায়াত এককভাবে ক্ষমতায় যাবে। তখন বাংলাদেশ কার্যত উগ্রবাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আবার এক ধরনের পূর্ব পাকিস্তানি বাস্তবতায় ফিরে যেতে পারে।
শেখ হাসিনার শাসন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তিনি বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক স্থিতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এনেছিলেন। সেই অর্জনগুলো ২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপর্যয়ে’ ধ্বংস হয়ে গেছে। তথাকথিত নতুন প্রজাতন্ত্র এখন পরিণত হয়েছে মিথ্যা, বিশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় পতনের প্রতীকে।
আগামী দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য আরও অস্থির ও বিপজ্জনক হতে চলেছে। জামায়াত ইতিমধ্যে প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিচারব্যবস্থায় নিজেদের লোক বসিয়ে একচ্ছত্র প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছে জামায়াতের পক্ষে। এই পচন দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে রাষ্ট্রের সব স্তরে।
লেখক:
জাজতি কে পাত্নায়েক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর ওয়েস্ট এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক।
চন্দন কে পাণ্ডা, সহকারী অধ্যাপক রাজীব গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au