চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৩০ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। তার পথচলা ছিল না সহজ কিংবা পূর্বপরিকল্পিত। এক সময়ের সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতার আসনে পৌঁছানো এই যাত্রা কেবল একটি রাজনৈতিক উত্থানের গল্প নয়, এটি সাহস, ত্যাগ এবং অনিবার্য দায়িত্ব গ্রহণের এক দীর্ঘ ইতিহাস। এই জীবনগাথা বহু নারীর কাছে নীরব অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
ভারতের জলপাইগুড়িতে ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে অনেকটাই নিরাবেগ ও স্বাভাবিক পরিবেশে। তার জীবনের প্রাথমিক পরিচয় ছিল সংসারকেন্দ্রিক। তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করার পর তার জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল স্বামী ও সন্তানকে ঘিরে।
একজন বাঙালি গৃহবধূ হিসেবে সংসার সামলানো, সন্তানদের বড় করা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনই ছিল তার প্রধান কাজ। রাজনীতি কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যাওয়ার কোনো প্রকাশ্য আকাঙ্ক্ষা তখন তার জীবনে দেখা যায়নি।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার জীবনে আসে প্রথম বড় মোড়। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছালে খালেদা জিয়ার জীবনেও পরিবর্তনের ছাপ পড়ে। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে তাকে নীরবে বহন করতে হয়েছে দায়িত্ব, শঙ্কা ও চাপ। যদিও তিনি তখনও সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না, তবে দেশের অস্থির সময়ে স্বামীর পাশে থেকে মানসিক সমর্থন দেওয়া ছিল তার জন্য বড় এক দায়িত্ব।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তার জীবনে এনে দেয় সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি এই ঘটনা তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় এক গভীর অনিশ্চয়তার সামনে। স্বামী হারানোর বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক শূন্যতা। সেই সময় পর্যন্ত যিনি ছিলেন গৃহকোণের মানুষ, তাকেই হঠাৎ করে আবিষ্কার করতে হয় জনজীবনের সামনে, যেখানে দলের নেতাকর্মী এবং সমর্থকেরা দিকনির্দেশনার জন্য তার দিকে তাকিয়ে আছে।

২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় এক অনুষ্ঠোনে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এটিই ছিল দুজনের মধ্যে সর্বশেষ সাক্ষাৎ। ছবি; বিবিসি
স্বামীর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার সামনে ছিল দুটি পথ। একদিকে সন্তানদের নিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যাওয়া, অন্যদিকে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় প্রবেশ করা। কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদের আহ্বান এবং জিয়াউর রহমানের আদর্শ রক্ষার তাগিদ তাকে রাজনীতির পথে নামতে বাধ্য করে। তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বের প্রতীক।
যিনি কখনও প্রকাশ্য রাজনীতিতে অভ্যস্ত ছিলেন না, তাকেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন এক দৃঢ় নেত্রী হিসেবে। এই সময় তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয়। রাজপথে আন্দোলন, বক্তৃতা এবং দল সংগঠনের দায়িত্ব নিতে গিয়ে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব এবং নানামুখী চাপ।
এই কঠিন সময়েও তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল একজন মা। রাজনৈতিক ব্যস্ততা এবং দমন-পীড়নের মাঝেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভাবনা থেমে থাকেনি। পরিবার ও রাজনীতির দ্বৈত চাপ তিনি বহন করেছেন নীরবে। ব্যক্তিগত সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে দেশ ও দলের দায়িত্বকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের পর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণের রায়ে বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। একজন গৃহবধু থেকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে পৌঁছানো এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তেমনি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও এক শক্ত বার্তা দেয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পথচলা ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিরোধ, প্রশাসনিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করে তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী চাইলে দুটি ভিন্ন জগত সমানভাবে সামলাতে পারেন।
পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার জীবনে আবারও নেমে আসে কঠিন সময়। একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়। বয়সজনিত অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত বেদনা সত্ত্বেও তিনি রাজনীতিতে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন থাকাই ছিল তার রাজনীতির মূল শক্তি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দৃঢ় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার সংগ্রাম নারীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। গৃহের দায়িত্ব পালন করেও একজন নারী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে পারেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং ইতিহাসের গতিপথে প্রভাব রাখতে পারেন।
জীবনের শেষ সময়গুলোতে তিনি সরাসরি রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় না থাকলেও তার প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। মা, স্ত্রী ও নেত্রী এই তিন ভূমিকায় তার জীবন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন। একজন সাধারণ বাঙালি গৃহবধু থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের নারী জাগরণের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au