চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৩০ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক প্রভাবশালী ও বহুল আলোচিত নাম। তিনি কেবল দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত, সাফল্য ও বিতর্ক বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তার শাসনামল বোঝার জন্য সময়, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। OTNBangla’র পাঠকদের তার শাসনামলেন চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।
বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ১৯৯১ সালে। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন। সেই সময় তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর ও স্থিতিশীল করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের অধীনে থাকায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার তার সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রথম মেয়াদে তার সরকার সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী কার্যকর করে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও সংসদের ভূমিকা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সিদ্ধান্তকে অনেক বিশ্লেষক গণতন্ত্রের পথে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনে বেসামরিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে তার প্রথম শাসনামল ছিল সীমিত সম্পদ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মধ্যে পরিচালিত। সে সময় বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শে কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটে। বেসরকারিকরণ, বাজারমুখী অর্থনীতি এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যাশিত সাফল্য তখনও সীমিত ছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন।
১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তার প্রথম মেয়াদের অবসান ঘটে। বিরোধী দলের আন্দোলন, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা তার সরকারের ওপর চাপ বাড়ায়। এরপর কয়েক বছর বিরোধীদলে থাকার পর ২০০১ সালে তিনি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই মেয়াদটি ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি চারদলীয় জোট গঠন করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই মেয়াদে খালেদা জিয়ার সরকার তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান থেকে দেশ পরিচালনা করে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিক্ষা খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্রাম পর্যায়ে বিদ্যুতায়ন, নারী শিক্ষা প্রসারে উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এই সময়ের উল্লেখযোগ্য দিক।
বিদেশনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রেও তার সরকার সক্রিয় ভূমিকা রাখে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়, যা প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়।
তবে এই মেয়াদেই তার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়। জঙ্গিবাদের উত্থান, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, সিরিজ বোমা হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সরকারকে চাপে ফেলে। বিরোধীদলগুলো অভিযোগ করে, এসব বিষয়ে সরকার যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দুর্নীতির অভিযোগও তার সরকারের বড় একটি দুর্বলতা হিসেবে আলোচিত হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ কয়েক বছর শীর্ষ অবস্থানে ছিল, যা সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল তার আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান। তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার পথে খুব কমই হেঁটেছেন। এর ফলে রাজনীতিতে সংঘাত ও মেরুকরণ বেড়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। সংসদ বর্জন, হরতাল এবং রাজপথের আন্দোলন এই সময় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করেছে।
নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল দ্বিমুখী আলোচনার বিষয়। একদিকে তিনি নিজেই একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা। অন্যদিকে, তার শাসনামলে নারী অধিকার ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার খুব জোরালোভাবে এগোয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। তবু নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কিছু অগ্রগতি দেখা যায়।
২০০৬ সালের শেষে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধ, সহিংসতা এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে তার সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি হলে তার রাজনৈতিক জীবন নতুন এক কঠিন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। গ্রেপ্তার, মামলা এবং দীর্ঘ সময় রাজনীতির বাইরে থাকা তার নেতৃত্বকে দুর্বল করে দেয়।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এক দৃঢ়চেতা কিন্তু বিতর্কিত নেতা। তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর দেশের রাজনীতিকে নির্বাচনী ধারায় ফিরিয়ে এনেছেন। একই সঙ্গে তার শাসনামলে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সংঘাত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
তার নেতৃত্বকে কেউ দেখেন শক্ত অবস্থান ও আদর্শিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে, কেউ দেখেন সুযোগ হারানো ও সংঘাতমুখী রাজনীতির উদাহরণ হিসেবে। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তার শাসনামল দেশের গণতন্ত্র, রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অনেক শিক্ষাও রেখে গেছে।
দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় আজ মঙ্গলবার সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যান।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au