বিশ্ব

ভিসা নীতিকে অস্ত্র বানাচ্ছে যুক্তরাজ্য, পরবর্তী লক্ষ্য কি বাংলাদেশ

  • 5:38 pm - December 28, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২২৮ বার
ভিসা নীতিকে অস্ত্র বানাচ্ছে যুক্তরাজ্য। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৮ ডিসেম্বর- অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নামে যুক্তরাজ্য সরকার ভিসা নীতিকে যেভাবে কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ হোম অফিস প্রকাশ্যভাবে সেই সব দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করছে, যারা যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের ফেরত নিতে গড়িমসি করছে বা সহযোগিতা করছে না। এই নীতির প্রথম বড় শিকার হয়েছে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। কূটনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই উচ্চঝুঁকির তালিকায় পরবর্তী লক্ষ্য কি বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই শঙ্কা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০২৪ সালের ১৬ মে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আগ্রহে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্রুত প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থী এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা। জাতীয়তার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকলে বাধ্যতামূলক সাক্ষাৎকারের শর্ত শিথিল করা হয়, যাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। সে সময় এটিকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবতায় এই চুক্তি এখন যুক্তরাজ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ব্রিটেনে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ব্রিটিশ হোম অফিসের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। মোট আবেদনের প্রায় ৬ শতাংশই বাংলাদেশিদের। শুধু গত এক বছরেই ছয় হাজার ৬০০ জনের বেশি বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, আর হাজার হাজার আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার গতি যদি বাড়ানো না যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য ভিসা সুবিধা সীমিত করা হবে।

এই প্রেক্ষাপটে আইনজীবী ও অভিবাসন বিশ্লেষক ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওপর যদি কোনোভাবে যুক্তরাজ্যের ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়, তাহলে এর প্রভাব হবে বহুমাত্রিক। শিক্ষার্থী, কর্মী, ব্যবসায়ী এমনকি ভ্রমণ ভিসা প্রত্যাশীদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হবে। তাঁর মতে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে একটি টেকসই ও বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে এখনই সরকারকে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।

ব্রিটিশ সরকারের বর্তমান কৌশল মূলত বৈদেশিক নীতির একটি লেনদেনভিত্তিক রূপ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নেতৃত্বে হোম অফিস পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কোনো রাষ্ট্র যদি ব্রিটেনে অবৈধভাবে থাকা নিজেদের নাগরিকদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সেই দেশের প্রভাবশালী শ্রেণির জন্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশের বিশেষ সুবিধা বাতিল করা হবে। এই তালিকায় কূটনীতিক, বড় ব্যবসায়ী এবং পর্যটকরা থাকবেন। প্রথম ধাপে এক মাসের নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর ফাস্ট ট্র্যাক ভিসা সুবিধা বাতিল করা হয়। সর্বশেষ ধাপে সব ধরনের ভিসা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

সম্প্রতি অ্যাঙ্গোলা ও নামিবিয়া শেষ মুহূর্তে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে এই কঠোর ব্যবস্থার মুখ থেকে রক্ষা পেলেও যুক্তরাজ্যের হোম অফিস ২০২৫ সালের জন্য একটি নতুন নজরদারি তালিকা প্রস্তুত করেছে। এই তালিকায় কঙ্গোর পাশাপাশি পাকিস্তান, ভারত, নাইজেরিয়া ও মিসরের নাম উঠে এসেছে। অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, এসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক এবং প্রত্যাবাসন সহযোগিতার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশও এই নজরদারি তালিকার বাইরে নেই। যদি চুক্তির বাস্তব প্রয়োগে প্রত্যাবাসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে, তাহলে ঢাকাকেও কঙ্গোর মতো কঠোর ভিসা জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাজ্য এখন আর কেবল আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়, তারা দৃশ্যমান ফলাফল চায়।

এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ। ২০২২ সালে প্রণীত ন্যাশনালিটি অ্যান্ড বর্ডারস অ্যাক্টের আওতায় পাওয়া ক্ষমতা এবারই প্রথম পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করছে লেবার সরকার। এর মাধ্যমে তারা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে, আশ্রয়প্রার্থীদের জট কমাতে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় তারা বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বারবার বলেছেন, নিয়ম মেনে চলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাঁর ভাষায়, সহযোগিতা না করলে তাৎক্ষণিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যেখানে ভিসাকে সীমান্ত সুরক্ষার একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত বছর যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন রেকর্ড এক লাখ ১১ হাজারের বেশি মানুষ। একই সময়ে আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় বহিষ্কার ও প্রত্যাবাসনের চাপ এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ নীতির বিষয় নয়। এটি ব্রিটিশ কূটনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হোম অফিস যখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাত্রা বাড়াচ্ছে, তখন বিশ্ব সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রশ্ন উঠছে, এই লেনদেনভিত্তিক পদ্ধতি সত্যিই কি অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে কার্যকর হবে, নাকি দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভিসা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কেই নয়, হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

এই শাখার আরও খবর

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ঝরল ১০ প্রাণ, আহত আরও ২০

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: নাটোরের বড়াইগ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ। যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন।…

‘আমি ভয় পাই না’, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা আবারও বললেন শেখ হাসিনা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে পারেন বলে…

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানত না সরকার

সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া ও অভিযোগের বিস্তারিত জানতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের দূতাবাস বা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au