ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন জেলেনস্কি। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৮ ডিসেম্বর- ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি শান্তি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়ে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বৈঠকে বসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থানগত পার্থক্য এবং একই সময়ে রাশিয়ার নতুন করে বিমান হামলা এই আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শনিবার রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এসব হামলায় কিয়েভের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও গরম পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। জেলেনস্কি এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান শান্তি প্রচেষ্টার প্রতি রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠক সামনে রেখে জেলেনস্কি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় তিনি পূর্ব ইউক্রেনের বিতর্কিত দনবাস অঞ্চল, জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করবেন। রোববার ট্রাম্পের ফ্লোরিডার বাসভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইউক্রেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরহি কিসলিৎসিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, শনিবার গভীর রাতে জেলেনস্কি ও তার প্রতিনিধিদল ফ্লোরিডায় পৌঁছেছেন। ‘গুড ইভনিং, ফ্লোরিডা!’ লিখে তিনি একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নাম সংবলিত একটি উড়োজাহাজ দেখা যায়।
দনবাস ইস্যুতে অবস্থানগত ব্যবধান এখনো বড় বাধা হয়ে আছে। মস্কো বারবার দাবি করে আসছে, ইউক্রেনকে পুরো দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে, এমনকি যেসব এলাকা এখনো কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেগুলোকেও। রাশিয়ার কর্মকর্তারা শান্তি পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশে আপত্তি জানিয়ে আসছেন, ফলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আদৌ রোববারের আলোচনায় উদ্ভূত কোনো সমঝোতা মেনে নেবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি জানান, তিনি এখনো চেষ্টা করছেন এমন একটি মার্কিন প্রস্তাবকে নরম করতে, যেখানে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে পুরো দনবাস অঞ্চল থেকে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে কয়েক সপ্তাহের আলোচনার ফল হিসেবে তৈরি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনাটি গণভোটে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
অ্যাক্সিওস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জেলেনস্কির এই গণভোটের প্রস্তাবকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে জেলেনস্কি আর পুরোপুরি ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিচ্ছেন না। তবে তিনি শর্ত দিয়েছেন, রাশিয়াকে অন্তত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে, যাতে ইউক্রেন এই গণভোটের প্রস্তুতি ও আয়োজন করতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনীয় ভোটারদের বড় অংশ এই পরিকল্পনাও প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকটি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা কূটনৈতিক তৎপরতার ধারাবাহিকতা। ইউরোপীয় মিত্ররা অনেক সময় আলোচনার বাইরে থাকলেও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা জোরদার করেছে।
ভূখণ্ড প্রশ্নে অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। কিয়েভ ও ওয়াশিংটন অনেক বিষয়ে একমত হলেও কোন এলাকা, আদৌ কোনো এলাকা, রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে কি না, সে প্রশ্নের সমাধান হয়নি। জেলেনস্কি শুক্রবার জানান, ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
মস্কো যেখানে পুরো দনবাস দাবি করছে, সেখানে ইউক্রেন চায় বর্তমান যুদ্ধরেখা অনুযায়ী মানচিত্র স্থির রাখতে। আপসের চেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে, ইউক্রেন যদি ওই এলাকা ছাড়ে তাহলে সেখানে একটি মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে বাস্তবে এই অঞ্চল কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে আগের বৈঠকগুলো খুব একটা মসৃণ না হওয়ায় জেলেনস্কি এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন পুনর্গঠনের দায় চাপিয়ে দিতে পারে। রাশিয়া ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৭ বর্গকিলোমিটার ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড দখল করেছে বলে তথ্য রয়েছে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। প্রায় চার বছর আগে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১২ শতাংশ দখলে নিয়েছে মস্কো। এর মধ্যে দনবাসের প্রায় ৯০ শতাংশ, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনের ৭৫ শতাংশ এবং খারকিভ, সুমি, মিকোলাইভ ও দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের কিছু অংশ রয়েছে বলে রাশিয়ার হিসাব।
গত ১৯ ডিসেম্বর পুতিন বলেন, শান্তি চুক্তি হতে হলে ২০২৪ সালে নির্ধারিত তার শর্ত মানতে হবে। সেই শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে দনবাস, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চল থেকে ইউক্রেনের সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার এবং ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার লক্ষ্য থেকে কিয়েভের আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসা।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা ও ইউরোপীয় নেতারা এই যুদ্ধকে মস্কোর সাম্রাজ্যবাদী ভূমি দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের ক্ষেত্রে রাশিয়া সফল হলে ভবিষ্যতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকেও আক্রমণ করতে পারে।
এই ২০ দফা পরিকল্পনাটি এসেছে রাশিয়া-নেতৃত্বাধীন একটি ২৮ দফা প্রস্তাব থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দমিত্রিয়েভের মধ্যে আলোচনার পর সেই প্রস্তাবটি তৈরি হয় এবং গত নভেম্বর তা প্রকাশ্যে আসে। পরে ইউক্রেনীয় ও মার্কিন আলোচকদের ধারাবাহিক বৈঠকে তুলনামূলকভাবে কিয়েভবান্ধব ২০ দফা পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়।
এরই মধ্যে কানাডা ও ইউরোপীয় মিত্ররা ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। শনিবারের রুশ বিমান হামলা প্রমাণ করে যে পুতিন শান্তি চান না বলে মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। কানাডার নোভা স্কশিয়ার হ্যালিফ্যাক্সে পৌঁছে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন, যেখানে তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
জেলেনস্কির পাশে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে কার্নি বলেন, শান্তির জন্য একটি আগ্রহী রাশিয়া প্রয়োজন। কিয়েভে রাতভর হামলাকে ‘বর্বরতা’ আখ্যা দিয়ে তিনি এই কঠিন সময়ে ইউক্রেনের পাশে থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং দেশটিকে অতিরিক্ত ২৫০ কোটি কানাডিয়ান ডলার অর্থনৈতিক সহায়তার ঘোষণা দেন।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েনও শনিবার জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করে একটি ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠাই তাদের অভিন্ন লক্ষ্য। একই সঙ্গে ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি আবারও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। যুদ্ধ, শান্তি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে এই বৈঠকগুলো যে ইউক্রেন সংকটের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ রয়টার্স