ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষ, নিহত ১
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ পড়ানোর ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে…
মেলবোর্ন, ২ জানুয়ারি- দক্ষিণ এশিয়া ঘিরে তুরস্কের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। আধুনিক তুরস্ক এবং তার পূর্বসূরি অটোমান সাম্রাজ্যের এই অঞ্চলের প্রতি আকর্ষণ কয়েক শতাব্দী পুরোনো। তবে দীর্ঘ সময় তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারার উপস্থিতি জোরালো হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, এই সক্রিয়তা এখন শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং সামরিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক যে ‘নব্য-অটোমান’ পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটছে, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দক্ষিণ এশিয়া। ঐতিহাসিক ধর্মীয় বন্ধন, মুসলিম পরিচয়ের রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার লক্ষ্য তুরস্ককে আবারও এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় করে তুলেছে।
২০২৫ সাল দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ভূমিকাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, গত বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষের সময় তুরস্ক সরাসরি পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়ে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দিল্লির লালকেল্লায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ভারতীয় তদন্তকারীরা একজন তুর্কি হ্যান্ডলারের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এসব ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক, পাকিস্তান ও আজারবাইজানের মধ্যে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘থ্রি ব্রাদার্স’ বা ‘তিন ভাই’ প্রতিরক্ষা সমঝোতা দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারার সামরিক উপস্থিতিকে আরও দৃঢ় করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট শুধু প্রতীকী নয়, বরং বাস্তব সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরি করছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্কের শিকড় গভীরে প্রোথিত ইতিহাসে। ইতিহাসবিদদের মতে, দিল্লির সুলতানি শাসন থেকে শুরু করে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রে তুর্কি বংশোদ্ভূত শাসকদের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর অটোমান প্রযুক্তির কামান ও বন্দুক ব্যবহার করে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করেছিলেন, যা এই দুই অঞ্চলের সামরিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের সামুদ্রিক আধিপত্য এবং পারস্যের সাফাভি সাম্রাজ্যের বিস্তার ঠেকাতে মুঘল ও অটোমানরা প্রায়ই কৌশলগত সহযোগিতায় যুক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে অটোমান খিলাফত রক্ষায় ভারতীয় মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংহতির এক ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তিনি অটোমান ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ঐতিহাসিক বিপর্যয় হিসেবে দেখেন এবং সেই গৌরব পুনরুদ্ধারের আদর্শিক আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। এই আদর্শিক মিলের কারণেই পাকিস্তান তুরস্কের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানে তুর্কি টেলিভিশন নাটক ও সংস্কৃতির জনপ্রিয়তাও তুরস্কের সফট পাওয়ার কৌশলের শক্ত উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কের দক্ষিণ এশিয়ায় আগ্রহের পেছনে একাধিক কৌশলগত হিসাব রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তুরস্ককে মুসলিম বিশ্বে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করে আঙ্কারা একদিকে নিজের প্রতিরক্ষা শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই পাকিস্তানমুখী নীতি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রকাশ্য পাকিস্তানপন্থী অবস্থান এবং ভারতের সঙ্গে গ্রিস ও আর্মেনিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা আঙ্কারা ও দিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সীমিত করে ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ধারায় একুশ শতকেও ধর্ম, রাজনীতি ও ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণে দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত তুরস্কের এই প্রভাব বলয় আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
(দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত অখিলেশ পিল্লালামারির বিশ্লেষণ অবলম্বনে)
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au