আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২ ডিসেম্বর- হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মব সহিংসতায় আতঙ্কের বছর ২০২৫। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্ন হলেও একই রকম চরিত্রের অপরাধ প্রবণতা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বছরের পর বছর ধরে অপরাধের ধরনে যে পরিবর্তন দেখা গেছে, ২০২৫ সালে তা আরও নগ্ন ও সহিংস রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে বাধাহীন মব সহিংসতা ছিল এ বছরের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ধর্ম অবমাননা, সামাজিক বিরোধ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সন্দেহের ভিত্তিতে দলবদ্ধ হয়ে মানুষকে আক্রমণ, মারধর ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে একের পর এক। এসব ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নারী, শিশু, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বারবার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় ঘটে যায় বছরটির অন্যতম নৃশংস ঘটনা। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে তার মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
এর আগে ৯ জুলাই ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে প্রকাশ্য রাস্তায় লালচাঁদ সোহাগকে ইট-পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। দিনের আলোয় এমন নৃশংসতা নগর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
২০২৫ সালে আদালত প্রাঙ্গণেও সহিংসতা থামেনি। ঢাকা ও খুলনায় আদালত চত্বরে তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১০ নভেম্বর প্রায় ২৯ বছর আগের একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ফেরার পথে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে খুন হন তারিক সাইফ মামুন।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে দেশে হত্যা মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৫০৯টি। আগের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২২৮টি। অর্থাৎ এক বছরে হত্যা মামলা বেড়েছে অন্তত ২৮১টি। যদিও পুলিশ বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যেসব মামলা আগে করা যায়নি, তার কিছু এখন নথিভুক্ত হওয়ায় সংখ্যাটি বেড়েছে।
একই সময়ে সারাদেশে সব ধরনের অপরাধে মামলা হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজারের বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ হাজার ১২২টি বেশি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, গত ১১ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৯৮ জন।
অপহরণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের চিত্রও ভয়াবহ। ২০২৪ সালের প্রথম ১১ মাসে অপহরণের মামলা ছিল ৫৬৮টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজারের বেশি, অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় ৪৪৬টি মামলা বেশি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায়ও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৬ হাজার ৩৬৬টি মামলা হলেও ২০২৫ সালে একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৬৯১টি।
মার্চ মাসে মাগুরায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর তার মৃত্যুর ঘটনা সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার ওই শিশুটি ১৩ মার্চ মারা যায়। এই ঘটনায় সারা দেশে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সারা বছরজুড়েই মব সন্ত্রাস ছিল সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৮৪ জন। এসব ঘটনায় মাজার ও খানকায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন জায়গায় ‘তৌহিদী জনতা’ বা ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ ব্যানারে সংঘবদ্ধ হামলা চালানোর চিত্র দেখা গেছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধও ছিল নিয়মিত ঘটনা। ঢাকাতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন অন্তত এক হাজার ৪৯৮টি আন্দোলন করেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে চারটি করে আন্দোলন বা সড়ক অবরোধ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনায় অধিকাংশ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান ও কঠোর ভূমিকা দেখা যায়নি। পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় সুযোগসন্ধানীরা আরও সাহস পেয়েছে বলে মত অনেকের।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছে, তা বাস্তবে লোক দেখানো ছাড়া কিছু নয়। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলনের পর পুলিশ সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, এই অধ্যাদেশ তা ব্যর্থ করে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালকে অনেকেই দেখছেন আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের বছর হিসেবে। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাষ্ট্র কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au