ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ জানুয়ারি- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি নতুন ও উদ্বেগজনক উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে এআই ব্যবহার করে সহিংসতা ও ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা সদিচ্ছা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না। সরকারও এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা: ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ সিজিএস এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ডিজিটাল রূপান্তর একদিকে দেশকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের বৈষম্যও সৃষ্টি করছে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়েছে, তবে এখন প্রয়োজন একটি একীভূত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা। তিনি বলেন, এই তথ্যভান্ডার নির্বাচন কমিশন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে না রেখে একটি স্বায়ত্তশাসিত, নজরদারিভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের অধীনে রাখা উচিত। একই সঙ্গে নতুন সাইবার সিকিউরিটি অর্ডন্যান্সকে আগামী সরকারকে বৈধতা দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো আসন্ন নির্বাচনে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়েও জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
ডিজিটাল রূপান্তরের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, এ খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলেও প্রথাগত কর্মসংস্থানে নানা ধরনের সংকট দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, চব্বিশের আগস্ট আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে, এই মাধ্যম কতটা শক্তিশালী। ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তৎকালীন হাসিনা সরকারের নৈতিক পরাজয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশিষ্টজনেরা বলেন, সুশাসন ও কার্যকর গণতন্ত্র ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক পরিবেশ অপরিহার্য। তারা বলেন, গণতন্ত্র না থাকলে ডিজিটাল অর্থনীতির যে সম্ভাবনাময় বিকাশ ঘটছে, সেটিও টেকসই হবে না। বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের ঋণ নিতে গেলে শুরু থেকেই নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়, যার কারণে অনেক প্রবাসী বিনিয়োগকারীও বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, দুর্নীতি ও ঘুষের চক্র থেকে বের হওয়ার অন্যতম পথ হতে পারে ডিজিটাল পদ্ধতির বিস্তৃত ব্যবহার। তিনি তরুণ আইটি উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, কেবল অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশন করলেই হবে না, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পাশের দেশ থেকে অনেকেই সিলিকন ভ্যালিতে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলেও আমরা সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ই-কমার্স খাতে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও সন্তোষজনক নয়। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা ও ডিজিটাল স্বাক্ষরতা বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।
সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চেয়ারম্যান জেবেল রহমান ঘানি, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলীলী, বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, নারী উদ্যোক্তা তাজমিন নাসরিনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।