বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অস্থির সময়ে হিন্দু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কেন এখন অপরিহার্য

  • 5:01 pm - January 14, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২৮ বার
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক।ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন ১৪ জানুয়ারি: একটি দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে নৈতিক অবস্থান হারাতে পারে নানা উপায়ে। তবে সবচেয়ে নীরব অথচ ভয়ংকর উপায়টি হলো, যখন কোনো দেশের ছাত্রছাত্রীরা কেবল তাদের পাসপোর্টের কারণে হোস্টেল থেকে বেরোতে ভয় পেতে শুরু করে। আজকের বাংলাদেশ সেই বিপজ্জনক সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

ঢাকায় পড়তে আসা এক ভারতীয় মেডিকেল ছাত্র করিমের কথা ধরা যাক (আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ছদ্মনামে তাঁর কথা উঠে এসেছে)। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি নিজের হোস্টেল কক্ষে নিজেকে তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরীক্ষার চাপ নয়, বরং ভয়ই তার কারণ। দরজা খোলার আগে কান পেতে শোনেন। বাজারে যেতে এড়িয়ে চলেন। নিজের উচ্চারণ পর্যন্ত লুকান। বাবার সারা জীবনের সঞ্চয়ের অর্থে তাঁর শিক্ষাজীবন এখন প্রতিদিন সতর্কতার এক কঠিন অনুশীলন। একসময় যে বাংলাদেশ ছিল তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি, আজ তা তাঁর নিজের ভাষায় যেন এক কারাগার।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৯ হাজারের বেশি ভারতীয় মেডিকেল ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে। তারা এখানে এসেছে রোমাঞ্চের খোঁজে নয়, বরং বাস্তবতার তাড়নায়। ভারতে প্রতি বছর ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী মেডিকেলে ভর্তির জন্য আবেদন করে, কিন্তু সরকারি আসন ৬০ হাজারেরও কম। বেসরকারি কলেজে পড়ার খরচ অনেকের নাগালের বাইরে। বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অর্ধেক খরচে মেডিকেল শিক্ষা দেয়। হাজার হাজার মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারের কাছে এটি পছন্দ নয়, বরং বাধ্যতামূলক বিকল্প।

দীর্ঘদিন এই ব্যবস্থাটি কার্যকর ছিল। ভারতীয় ছাত্ররা ঢাকার জীবনধারায় মিশে যেত, বাংলাদেশি সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা করত এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নীরবে অবদান রাখত। রাজনীতি ছিল পেছনের শব্দমাত্র। কিন্তু আজ সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। ছাত্র-আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। পরে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়া এবং ভারতের তাঁকে প্রত্যর্পণ না করা বাংলাদেশে ভারতবিরোধী ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়। এই ক্ষোভ কাগজে বা সংসদে নয়, রাস্তায় নেমে আসে। 

ডিসেম্বর মাসে এক ভারতীয় ছাত্রকে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা মারধর করে, তার ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়, সিসিটিভিতে সেই দৃশ্য ধরা পড়ে। এর পর থেকেই ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্ররা নিজেদের ঘরে বন্দি থাকে, ফিসফিস করে কথা বলে, বাইরে কিছু বলার আগে ঝুঁকি হিসাব করে।

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিদেশি ও সংখ্যালঘুরাই প্রথম লক্ষ্যবস্তু হয়। বাংলাদেশ এখনো সেই ভয়াবহ পরিণতির পথে না গেলেও, গতিপথই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ দেশটি এখন একটি উত্তপ্ত ও অনিশ্চিত জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেশি চোখে পড়ছে, আর রাজনৈতিক ভাষ্য ক্রমেই কঠোর ও বিভাজনমূলক হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তী সরকার বারবার আশ্বাস দিচ্ছে যে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

কিন্তু ভয় কোনো সরকারি বিবৃতি বা পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ভয় ধরা পড়ে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে। ধরা পড়ে মানুষ কথা বলার সময় নিজের উচ্চারণ বদলে নেয় কি না, কিংবা পরিচয় গোপন রাখে কি না। আর সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে রাতে বিছানায় শুয়ে মোবাইলের পর্দায় খবর স্ক্রল করতে করতে, আগামীকালের শিরোনামটি নিজের জীবনকে কীভাবে বদলে দেবে, সেই অনিশ্চিত আশঙ্কায়।

ভারতীয় হিন্দু ছাত্রদের জন্য এই ভয় আরও গভীর। শেখ হাসিনার পতনের পর হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবর বেড়েছে। সরকার একে রাজনৈতিক বলে ব্যাখ্যা করলেও, যার পরিচয়ের কারণে আচরণ বদলে যায়, তার কাছে এই পার্থক্য অর্থহীন।

ভারতেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। অভ্যন্তরীণ নীতিতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলেছে। এটি কোনো একক দেশ বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ভারতীয় ছাত্ররা শুধু ফি নয়, আঞ্চলিক আস্থা ও বিনিময়ও নিয়ে আসে। শিক্ষা রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার কথা, কিন্তু সেই দেয়াল ভেঙে পড়ছে।

করিম বলেন, তিনি চান তিনি কখনো বাংলাদেশে না আসতেন। একটি মেডিকেল ডিগ্রির জন্য কঠোর অধ্যবসায় দরকার, ছদ্মবেশ নয়। হোস্টেল হওয়া উচিত বিশ্রামের জায়গা, বন্দিশালা নয়। আর কোনো ছাত্রেরই উচিত নয় রাতে শুয়ে ভাবতে থাকা আগামীকাল পরিস্থিতি তার জন্য কী বিপদ ডেকে নিয়ে আসবে?

বাংলাদেশ ও ভারত যদি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদের জিম্মি হওয়া থেকে রক্ষা করতে না পারে, তাহলে এর মূল্য দিতে হবে অনেকদিন ধরে।

এম এ হোসেন|Eurasia Review

বাংলাদেশভিত্তিক রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক

এই শাখার আরও খবর

অটো পাইলট মোডে মহাসড়কের মাঝখানে থেমে যায় টেসলা, পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় চালক নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় গভীর রাতে ব্যস্ত মহাসড়কের মাঝখানে একটি টেসলা গাড়ি হঠাৎ সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার পর পেছন থেকে আসা বিশালাকৃতির ফোর্ড এফ-৩৫০ পিকআপ ট্রাকের ধাক্কায় গাড়িটির…

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au