‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ১৪ জানুয়ারি- সারা দেশে তীব্র বিক্ষোভ, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট এবং বিদেশি চাপের মুখেও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতাকাঠামোয় এখনো বড় ধরনের ভাঙন দেখা যায়নি। বিশেষ করে দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক অভিজাত মহলে এমন কোনো বিভক্তির লক্ষণ নেই, যা সরকার পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। রয়টার্সকে দেওয়া কূটনীতিক, মধ্যপ্রাচ্যের সরকারি সূত্র ও বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কারণেই বিশ্বের অন্যতম টেকসই সরকার হিসেবে পরিচিত ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আপাতত টিকে আছে।
চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অভিযানের সমালোচনা করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল রাজপথের বিক্ষোভ বা বিদেশি চাপ দিয়ে এই সরকারকে হটানো কঠিন। যতক্ষণ না ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে ভাঙন তৈরি হয়, ততক্ষণ বর্তমান শাসন কাঠামো দুর্বল হলেও টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
ইরানের এক সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চলমান বিক্ষোভে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি এসব মৃত্যুর জন্য যাদের তিনি সন্ত্রাসী বলেছেন, তাদের দায়ী করেছেন। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর আগে প্রায় ৬০০ মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা ৫৭৩ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৫০৩ জন বিক্ষোভকারী এবং ৬৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। সংগঠনটির মতে, ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ইরান সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করেনি এবং রয়টার্সও তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শক্ত নিরাপত্তা কাঠামোই সরকারের বড় ভরসা। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠা এই কাঠামো বাইরের চাপকে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল জনসমাগমের বিক্ষোভ প্রয়োজন, পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীতে ভাঙন সৃষ্টি হতে হবে।
৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এর আগেও একাধিক গণআন্দোলন সামলেছেন। ২০০৯ সালের পর এটিই পঞ্চম বড় ধরনের অভ্যুত্থানমূলক বিক্ষোভ। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের পল সালেমের মতে, এটি সরকারের স্থিতিশীলতা নয়, বরং সংকটের মধ্যেও টিকে থাকার ক্ষমতার প্রমাণ। যদিও তিনি স্বীকার করেন, দেশটি গভীর ও অমীমাংসিত অভ্যন্তরীণ সংকটে ভুগছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে বিক্ষোভকারীদের এমন গতি তৈরি করতে হবে, যা রাষ্ট্রের শক্ত ভিত্তিকে অতিক্রম করতে পারে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শাসনের প্রতি অনুগত একটি বড় জনগোষ্ঠী এবং প্রায় ৯ কোটি মানুষের বিশাল দেশ হওয়ায় সরকার এখনো কৌশলগত সুবিধায় রয়েছে।
তবে টিকে থাকাই স্থিতিশীলতা নয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত, পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট পথ নেই। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে কৌশলগতভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে দেশটি। পারমাণবিক কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বড় ক্ষতির কারণে তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা সরকারের যে সামান্য বৈধতা অবশিষ্ট ছিল, তাও আরও ক্ষয়ে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ট্রাম্পের সরাসরি হুমকি। তিনি বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়েছেন এবং সাহায্য আসছে বলেও মন্তব্য করেছেন। একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গে বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা রাষ্ট্রগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আগ্রহ আদর্শগত নয়, বরং কৌশলগত। উদ্দেশ্য হতে পারে ইরানকে এমনভাবে দুর্বল করা, যাতে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার মতো ছাড় আদায় করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু মহলে ভেনেজুয়েলা মডেলের কথাও আলোচনায় এসেছে, যেখানে শীর্ষ নেতৃত্ব সরিয়ে রেখে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাকি অংশকে সহযোগিতার শর্তে টিকিয়ে রাখা হয়। তবে ইরানের ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন, কারণ দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো বহু দশক ধরে শক্তভাবে গড়ে উঠেছে এবং দেশটি জাতিগত ও ভৌগোলিকভাবে অনেক বেশি জটিল।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ হলে ইরান জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে, বিশেষ করে কুর্দি ও সুন্নি বালুচ অধ্যুষিত এলাকায়।
এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা অন্যত্র ব্যস্ত থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ডেভিড মাকোভস্কির মতে, ট্রাম্প যদি কোনো পদক্ষেপ নেন, তা দীর্ঘ যুদ্ধ নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি ও বড় প্রভাব ফেলার মতো অভিযান হতে পারে। তেল রপ্তানিতে বাধা, লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক বা সাইবার হামলার মতো বিকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে, যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই বড় ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, ট্রাম্প কখনো হুমকি দেন সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে, কখনো প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করতে, আবার কখনো সত্যিই হস্তক্ষেপের প্রস্তুতির সংকেত দিতে। ইরানের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কোন পথ তিনি বেছে নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্রঃ রয়টার্স
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au