বাংলাদেশ

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা : মুহাম্মদ ইউনূস কেন আতঙ্কিত

  • 7:14 pm - January 16, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬২ বার
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৬ জানুয়ারি- নতুন বছর শুরু হলেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার অবসান হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয়, তা এখনো কাটেনি। বরং সেই সংকট আরও গভীর হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের স্থলে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, সেটিকে সংবিধানবহির্ভূত ও অবৈধ আখ্যা দিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় ২০২৬ সালেও ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

গত দেড় বছরে অনেক ঘটনা ঘটেছে। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ যে স্বস্তি বা আশার প্রত্যাশা করেছিল, তা পূরণ হয়নি। উল্টো দেশজুড়ে সহিংসতা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ জনতা নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আন্দোলন ও সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনীতি, প্রশাসন এবং সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করা হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকগুলো একের পর এক আক্রমণের শিকার হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ও মুজিবনগর সরকারের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারগুলোর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নাট্যকর্মী, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের ন্যায়বিচারের সুযোগ দেওয়া হয়নি। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার সময়েই আইনের শাসন কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।

এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তাঁর ছেলে তারেক রহমানের ১৭ বছর পর দেশে ফেরা রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশে ফিরে প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিলেও বিএনপির কিছু শীর্ষ নেতার বক্তব্যে আবারও পুরোনো বিভাজনের রাজনীতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। খালেদা জিয়ার জানাজাকে কেন্দ্র করে একজন বিএনপি নেতা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে তা জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। আরেক নেতা দাবি করেন, আওয়ামী লীগ নাকি ভারতের নির্দেশে দেশ শাসন করেছে, যা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি ঢাকায় এসে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেন। তবে তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এটিকে অনেকেই ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন যে, ভারত ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

বিএনপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় নির্বাচনী কৌশল নিয়ে চাপে রয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলোর বাড়তে থাকা প্রভাব বিএনপিকে ভাবাচ্ছে। একসময় জামায়াত বিএনপির জোটসঙ্গী হলেও বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে দলটির প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা চলছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে সেই নির্বাচন আদৌ গ্রহণযোগ্য হবে কি না। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির কয়েকজন সদস্য ও যুক্তরাজ্যের কয়েকজন সংসদ সদস্য ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সব বড় রাজনৈতিক দল অংশ না নিলে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হবে না।

আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁর দলকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি দলের সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছেন, যদি নির্বাচনী প্রতীক নৌকা ব্যালটে না থাকে, তাহলে ভোটে অংশ না নিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এতে করে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

এই অবস্থায় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, ইতিহাস ধ্বংস, আওয়ামী লীগবিরোধী অভিযান এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে এই সরকার নৈতিকভাবে নির্বাচন আয়োজনের যোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আদৌ হবে কি না।

যদি নির্বাচন হয় এবং বিএনপি জয়ী হয়, তবুও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে কিনা তা অনিশ্চিত। কারণ আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ভোটে অংশ নেবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং নতুন করে নির্বাচনের দাবিও উঠতে পারে।

এদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তাঁদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ উঠলেও অন্তর্বর্তী সরকার তা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের রাজনীতি অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের বাস্তবায়ন আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, গত দেড় বছরে সহিংসতা, আইনের শাসনের অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষয় যে মাত্রায় হয়েছে, তাতে খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা কঠিন। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন অনেকেই। তবে ২০২৬ সালে সেই পরিবর্তনের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না।

সূত্রঃ ওপেন দ্য ম্যাগাজিন ডটকম

এই শাখার আরও খবর

আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

এশিয়ান কাপ শেষে ইরানে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় নারী ফুটবলাররা, অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষার দাবি জোরালো

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ: ২০২৬ নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, ইরানি-অস্ট্রেলীয় কমিউনিটি এবং খেলোয়াড়দের অধিকার…

তেহরান ও ইসফাহানে ইসরায়েলের নতুন দফায় ‘ব্যাপক’ বিমান হামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরান ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ইসফাহানে নতুন দফা ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী…

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাইলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, হামলা স্থগিতের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরানের অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালানোর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au