আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ১৬ জানুয়ারি- বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। রাজধানী ঢাকায় ছাত্রনেতা শরিফ উসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির পেছনে পাকিস্তানের মদদে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, পাশাপাশি এটিকে অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের দাবিও করছেন ছাত্রনেতারা।
ঢাকার একটি নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন ছাত্রনেতা শরিফ উসমান হাদি। ঘটনার ছয় দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, ১৮ ডিসেম্বরের পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজন হিন্দু নিহত হয়েছেন।
ছাত্রনেতাদের একটি অংশ এই সহিংসতার জন্য সরাসরি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে দায়ী করছে। তাদের দাবি, সেনাবাহিনীর একটি অংশ ক্ষমতায় আসার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি অস্থির করছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও গত কয়েক মাস ধরে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এটি হবে এমন একটি নির্বাচন, যেখানে আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না। ফলে নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনী নির্বাচনের জন্য আলাদা একটি গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করেছে। ওই ইউনিট থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
গত দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অন্তত দুইবার সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। গত নভেম্বরের শেষ দিকে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান এবং নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেনাবাহিনীকে অবহিত করার কথা বলেন। সরকার তখন নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও সেনাবাহিনী ফেব্রুয়ারির পর আর দেরি না করার বিষয়ে সতর্ক করে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ স্পষ্ট হয়।
আরেকটি বিরোধ তৈরি হয় সীমান্ত দিয়ে একটি করিডর নির্মাণের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। ইউনূস সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জাতিসংঘের প্রস্তাবিত রাখাইন করিডরের আওতায় একটি পথ ব্যবহারের বিষয়ে সম্মতির কথা জানান, যা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা। সেনাবাহিনীর বক্তব্য ছিল, এতে সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ বাড়তে পারে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির ছাত্র সংগঠনের আন্তর্জাতিক সেলের প্রধান আলাউদ্দিন মোহাম্মদ দাবি করেন, সেনাবাহিনীর একটি অংশ ড. ইউনূসের সরকারকে সরিয়ে দিতে চাইছে। তার ভাষায়, কিছু লক্ষ্যভিত্তিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনার পেছনে সেনাবাহিনীর একটি গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে, যাতে নির্বাচন ঠেকানো যায়।
ছাত্রনেতা হাদির হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করেনি। রাজধানীর রাস্তায় এমন ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কিছুই করতে পারেনি, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। তিনি আরও দাবি করেন, যদি শিক্ষার্থীদের আগে থেকে জানানো হতো, তাহলে এই সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব ছিল।
তার মতে, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনীর পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পারেনি। প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। বর্তমানে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিযোগে সেনাবাহিনীর ২৭ জন জেনারেল কারাবন্দী রয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী মনে করেন, গত দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে, বেকারত্ব বাড়ছে এবং এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ওপর জনগণের আস্থাও কমেছে। তার ভাষায়, এ কারণেই সেনাবাহিনী সময়মতো নির্বাচন চায় এবং নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে ড. ইউনূস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চাওয়ায় সেনাবাহিনী তাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছে, যা সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ছাত্রনেতা হাদির হত্যার পর পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে প্রচার চালিয়েছে যে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারত রয়েছে। তার মতে, গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তান বাংলাদেশে আবার সক্রিয় হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর ভেতরের একটি জামায়াতপন্থী অংশ পাকিস্তানের নির্দেশে কাজ করছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে সেনাপ্রধানের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়ে তাদের চাপে রেখেছে। সেনাবাহিনীর প্রায় ৪০ শতাংশ সদস্যের মধ্যে উগ্র চিন্তাধারা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন, যার ফলে সেনাপ্রধান এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
এই সহিংসতা নিয়ে সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাইলে মুখপাত্ররা কথা বলতে রাজি হননি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নির্বাচন পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। তারা সরাসরি কোনো অভিযানে নেই, তবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখছে। মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল সঞ্জয় কুলকার্নি বলেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কাঠামোর শিকড় ১৯৭১ সালের আগের পাকিস্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। সে কারণে এখনো সেনাবাহিনীর একটি অংশ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। তবে তার মতে, মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সদস্যের মধ্যে উগ্র চিন্তাধারা রয়েছে, বাকিরা এখনো বাঙালি জাতিসত্তার চেতনায় বিশ্বাসী।
তিনি জানান, বর্তমান সেনাপ্রধান ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন এবং তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বজায় রেখেছেন। সেনাবাহিনী আপাতত সরাসরি ক্ষমতা দখল এড়িয়ে চলছে, কারণ এতে জনগণের ওপর গুলি চালানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au