মেলবোর্ন, ২০ জানুয়ারি- মানুষের শারীরিক মৃত্যু- সব সংস্কৃতি ও ধর্মে চূড়ান্ত সত্য। যদিও হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ ও জৈন-সহ বিভিন্ন ধর্মে কর্মফলের ভিত্তিতে আত্মার পুনর্জন্মের ধারণা রয়েছে। আবার খ্রিস্টান, মুসলিম ও ইহুদি ধর্মে বিশ্বাস করা হয় পরকালের বিচার, পুনরুত্থান এবং স্বর্গ-নরকের চিরন্তন জীবনে।
তবে আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারের মালাগাসি জনগোষ্ঠীর কাছে মৃত্যুই শেষ নয়- বরং তা আরেকটি ভিন্ন জগতের শুরু। এমন বিশ্বাস থেকেই মালাগাসিদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে এক ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর রীতি- মৃতদের সঙ্গে নাচ।
‘ফামাদিহানা’: মৃতদেহ ঘুরিয়ে দেওয়ার উৎসব
মালাগাসি ভাষায় এই রীতির নাম ফামাদিহানা (Famadihana), যার অর্থ ‘হাড় উল্টে দেওয়া’ বা ‘মৃতদের সঙ্গে নাচ’। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর পূর্বপুরুষদের আত্মা আত্মিক জগতে অবস্থান করলেও তারা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে না। বরং পরিবার ও স্বজনদের কাছে ফিরে আসতে চায়।
মালাগাসিদের ধারণা, পারিবারিক সমাধিতে শায়িত পূর্বপুরুষেরা একঘেয়েমিতে ভোগে। তাই প্রতি ৫ থেকে ৭ বছর অন্তর কবর থেকে তোলা হয় মৃতদেহ। মৃতদেহগুলো বের করে রোদে রাখা হয়, পুরনো কাফনের বদলে নতুন- সাধারণত দামী সিল্কের কাপড়ে মোড়ানো হয়। এরপর শুরু হয় গান, নাচ, খাওয়া-দাওয়া আর উৎসব।
পরিবারের সদস্যরা মৃতদেহ কোলে নিয়ে নাচেন, আনন্দ করেন। এটি শোকের নয়, বরং মিলন ও উদযাপনের মুহূর্ত।
আত্মাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস
মালাগাসি বিশ্বাস অনুযায়ী, পূর্বপুরুষদের আত্মা পশু, গাছ কিংবা বাতাসের মধ্যেও বসবাস করতে পারে। তাই এই উৎসবে অংশ নিতে আসা পর্যটকদের সতর্ক করা হয়- আঙুল তুলে কিছু দেখানো যাবে না। কারণ এতে দুই জগতের মাঝখানে থাকা কোনো আত্মা অপমানিত হতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সরকারের বিধিনিষেধ
২০১৭ সালে মাদাগাস্কারে ভয়াবহ প্লেগের প্রাদুর্ভাবে প্রায় ১০০ মানুষের মৃত্যু হয়। তখন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন- ফামাদিহানার সময় কবর খোলা হলে সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্দেশ দেয়, যারা প্লেগ বা অন্য কোনো সংক্রামক রোগে মারা গেছেন, তাদের এমন সমাধিতে দাফন করা যাবে না যা পরে খোলা হতে পারে।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “প্লেগে মৃত ব্যক্তিকে যদি পরে ফামাদিহানার জন্য কবর থেকে তোলা হয়, তাহলে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।”
তবে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও রয়েছে প্রবল প্রতিক্রিয়া। এক নারী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “প্লেগ থাক বা না থাক, আমি আমার পূর্বপুরুষদের হাড় ঘোরানোর রীতি পালন করব। প্লেগ একটি মিথ্যা।”
মৃতদের জন্য উপহার
এই উৎসবে মৃত স্বজনদের জন্য আনা হয় উপহারও। কেউ যদি জীবিত অবস্থায় সুগন্ধি পছন্দ করতেন, তাহলে তার শরীরে ঢেলে দেওয়া হয় পুরো পারফিউমের বোতল। এটি ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণের প্রতীক।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতা
পর্যটকরাও চাইলে এই উৎসবে অংশ নিতে পারেন, যদিও জায়গা খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। ফরাসি বা মালাগাসি ভাষা না জানলে নির্দিষ্ট স্থান জানা কঠিন। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মাদাগাস্কারের পাহাড়ি অঞ্চলে শত শত ফামাদিহানা অনুষ্ঠিত হয়।
তবে যারা যান, তাদের একটি বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হয়- গন্ধ। একাধিক কবর খুঁড়া হলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যুর ও পচনের তীব্র গন্ধ। উৎসব শেষে আবার মৃতদেহগুলো আগের সমাধিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ফামাদিহানার ভবিষ্যৎ
আজও বহু মালাগাসি পরিবার ফামাদিহানা পালন করে, তবে রীতিটি ধীরে ধীরে কমে আসছে। কারণ দুটি- কিছু খ্রিস্টান সংগঠনের বিরোধিতা এবং বিপুল খরচ।
দামী সিল্কের কাফন, শত শত অতিথির আপ্যায়ন- সব মিলিয়ে অনেক পরিবারকে বছরের পর বছর সঞ্চয় করতে হয় এই একদিনের উৎসবের জন্য। তবুও মালাগাসিদের কাছে ফামাদিহানা কেবল একটি রীতি নয়। এটি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার এক অনন্য প্রকাশ।
সূত্র: এনডিটিভি