মেলবোর্ন ২৫ জানুয়ারি- যথাযথ আবেদন থাকা সত্ত্বেও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়াকে নাগরিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠনটি জানায়, জুয়েল হাসান সাদ্দামের মৃত স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন আমলে না নিয়ে তাকে প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে কেবল কারাফটকে মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। আসকের মতে, এই সিদ্ধান্ত সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়,
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী। ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের নিশ্চয়তা দেয় এবং ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড ও আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একজন বিচারাধীন বন্দী হিসেবেও জুয়েল হাসান সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন বলে উল্লেখ করেছে আসক।
সংগঠনটি বলছে,
স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা কার্যত তাকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে। এটি সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, ভিআইপি কিংবা সাধারণ সব শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দির নিকটাত্মীয়, যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা আপন ভাই-বোনের মৃত্যু হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদিও এটি প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়, তবে কোনো যুক্তি বা কারণ উল্লেখ না করে ইচ্ছামতো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যায় না বলে মন্তব্য করেছে আসক।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ টেনে আসক জানায়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ আইসিসিপিআরের রাষ্ট্রপক্ষ। ওই সনদের ৭ অনুচ্ছেদে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ এবং ১০(১) অনুচ্ছেদে স্বাধীনতাবঞ্চিত সকল ব্যক্তির সঙ্গে মানবিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণের কথা বলা হয়েছে। কারাফটকে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য মরদেহ দেখিয়ে একজন শোকাহত বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা এসব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আসক আরও বলেছে, কোন আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, তা জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। আইনের শাসন শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিবৃতিতে কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতাকে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আসকের মতে, এই ঘটনা একটি সংবিধানস্বীকৃত, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি জরুরি বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।